ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট (ইসিডি) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ট্রাইব্যুনাল টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের ২০০৫ সালের দু’টি বিস্ফোরণের পর কানাডার নিকো কোম্পানিকে বাংলাদেশকে ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দিয়েছে। পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান এই রায়কে নিশ্চিত করে বলেন, এই অর্থ দেশের জ্বালানি সেক্টরের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র ১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং পরের বছর কূপ খননের মাধ্যমে এক হাজার নব্বই থেকে এক হাজার নয়শত পঁচাত্তর মিটার গভীর পর্যন্ত নয়টি গ্যাস স্তর সনাক্ত করা হয়। প্রাথমিকভাবে গ্যাসটি স্থানীয় সিমেন্ট ও পেপার মিলের জন্য সরবরাহ করা হতো, তবে ২৬.৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের পর কূপে পানি উঠে আসায় খনন বন্ধ করা হয়।
২০০৩ সালে গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ক্ষেত্রটি কানাডার নিকো কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হয়। নতুন খনন কাজ শুরু হওয়ার পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন গ্যাসক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে দু’টি বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে মজুদ গ্যাস সম্পূর্ণ পুড়ে যায় এবং পার্শ্ববর্তী অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষতি হয়। পেট্রোবাংলা নিকোকে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও কোম্পানি তা দিতে অস্বীকার করে।
বিষয়টি স্থানীয় নিম্ন আদালতে ২০০৭ সালে মামলা হয়, যেখানে নিকোর ফেনি গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস বিলের আদায় বন্ধ করা হয় এবং হাইকোর্ট নিকোর বাংলাদেশে থাকা সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টেও বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেয়, তবে নিকো ২০১০ সালে ইসিডিতে দুইটি মামলা দায়ের করে।
ইসিডির ২০১৪ সালের রায়ে পেট্রোবাংলাকে ফেনি গ্যাসক্ষেত্রের বকেয়া গ্যাস বিল পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ২০১৬ সালে বাপেক্স নিকোর বিরুদ্ধে প্রায় ৯,২৫০ কোটি টাকা (প্রায় ১১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা দায়ের করে। একই ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত আদেশে নিকোকে উল্লেখিত পরিমাণের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়।
এই রায়ের ফলে পেট্রোবাংলার আর্থিক অবস্থায় স্বল্পমেয়াদে উল্লেখযোগ্য উন্নতি প্রত্যাশিত। ক্ষতিপূরণ অর্থ গ্যাস ক্ষেত্রের পুনরুদ্ধার, অবকাঠামো মেরামত এবং ভবিষ্যৎ গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্পের জন্য তহবিল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তদুপরি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এই রায় একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করবে, যা চুক্তি শর্তাবলীর কঠোরতা এবং বিনিয়োগ সুরক্ষার গুরুত্বকে তুলে ধরবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, গ্যাস সেক্টরের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় এই ধরনের আন্তর্জাতিক আইনি হস্তক্ষেপের প্রভাব বাড়ছে। নিকোর মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, বিশেষত পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং চুক্তি পালনের ক্ষেত্রে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ক্ষতিপূরণ অর্থের প্রবাহ পেট্রোবাংলার নগদ প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা বাড়াবে এবং সম্ভাব্য ঋণ পুনর্গঠন বা নতুন প্রকল্পের জন্য ক্রেডিট রেটিং উন্নত করতে সহায়তা করবে। তবে একই সঙ্গে, ভবিষ্যৎ গ্যাস অনুসন্ধান চুক্তিতে অধিকতর গ্যারান্টি এবং বীমা শর্ত যুক্ত করা হতে পারে, যা প্রকল্পের মোট খরচ বাড়াতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে, টেংরাটিলা ক্ষেত্রের ক্ষতিপূরণ পেট্রোবাংলার আর্থিক স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর প্রতি আনুগত্যের উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে। সরকার যদি এই রায়কে ভিত্তি করে নতুন গ্যাস চুক্তি পুনর্গঠন করে, তবে দেশীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও রপ্তানি সম্ভাবনা উভয়ই উন্নত হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ইসিডির রায় নিকোকে ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদান নিশ্চিত করেছে, যা পেট্রোবাংলার আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের শর্তাবলী পুনর্বিবেচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করবে। এই ঘটনা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার প্রভাবকে স্পষ্ট করে এবং ভবিষ্যৎ গ্যাস প্রকল্পের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশলকে পুনর্গঠন করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।



