চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলায় অবস্থিত একটি আশ্রয় প্রকল্পের বাড়িতে বুধবার বিকেল প্রায় ৪:৩০টায় তিন বছর বয়সী শিশুর গড়িয়ে পড়া গর্তে আটকে যাওয়ার ফলে মৃত্যু ঘটেছে। শিশুটির বড় বোন, নয় বছর বয়সী মিম আখতার, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং শিশুটির হাত ধরতে চেষ্টা করেন, তবে কয়েক মিনিটের পর তার গ্রিপ ছিন্ন হয়।
গর্তটি প্রায় ৩০ ফুট গভীর, সরু টিউব‑ওয়েল গর্ত, যা বাড়ি থেকে ২০‑২৫ ফুট দূরে এবং পরিবারের ও প্রতিবেশীদের ব্যবহৃত টিউব‑ওয়েলের প্রায় পাঁচ ফুট পাশেই অবস্থিত। গর্তের চারপাশে দীর্ঘদিন ধরে ঘন ঘাস ও গাছপালা বেড়ে গিয়েছিল, যা সম্প্রতি পরিষ্কার করার পর গর্তটি উন্মোচিত হয়ে শিশুদের জন্য মারাত্মক ফাঁদে রূপান্তরিত হয়।
মিমের ছোট ভাই মিসবাহ, যিনি প্রায় তিন বছর বয়সের, গর্তের কাছে খেলছিল। গর্তে পড়ে যাওয়ার পর মিম তার হাত ধরতে সক্ষম হন, তবে শ্বাস-প্রশ্বাসের অভাবে তার গ্রিপ শেষ পর্যন্ত ছিন্ন হয়। মিমের কণ্ঠে কাঁপা স্বরে বলা হয়, “আমি সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছিলাম, কিন্তু আমি তাকে বাঁচাতে পারিনি।” তার চোখ থেকে অবিরাম অশ্রু ঝরে, এবং দীর্ঘ সময়ের কান্নার পর তিনি শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
মিম, যিনি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়েন, জানিয়েছেন যে তার ভাই প্রায়ই তার সঙ্গে স্কুলে যেতে চেয়েছিল, তবে তার ছোট আকারের কারণে তিনি তাকে সঙ্গে নিতে পারেননি। তিনি ভবিষ্যতে তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন।
অগ্নিনির্বাপক দল গর্তে প্রবেশ করে প্রায় চার ঘণ্টা কাজ করে মিসবাহকে উদ্ধার করে। সন্ধ্যা ৮:৩০টায় শিশুটিকে গর্ত থেকে বের করা হয় এবং অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়, তবে চিকিৎসকেরা পরে জানায় যে শিশুটি ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে।
আশ্রয় প্রকল্পের অধীনে বরাদ্দকৃত ছোট বাড়িতে এখন গভীর শোকের পরিবেশ। পরিবারের প্রধান, সাইফুল আলম, যিনি দৈনিক শ্রমিক, এক ঘরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, আর অন্য ঘরে প্রতিবেশীরা মিসবাহের মায়ের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পরিবারটি পূর্বে এক ঘরে ঘুমাতো।
সাইফুল আলম জানান, “একটি মেয়ে ও একটি ছেলে থাকলেই যথেষ্ট, আমরা কতই না গরিব, তবু দুজনেরই শিক্ষা দিতে চেয়েছি।” তার কথায় পরিবারের শিক্ষার প্রতি অটুট ইচ্ছা প্রকাশ পায়।
প্রতিবেশী ইসমাইল হোসেন গর্তের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং ঘটনাটিকে শুধুমাত্র দুর্ঘটনা হিসেবে বাদ দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, “এই বাড়ি ও টিউব‑ওয়েল গর্তের নিকটবর্তী অবস্থা দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল, যা এখন দুঃখজনকভাবে প্রকাশ পেয়েছে।” তার বক্তব্যে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি তুলে ধরা হয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ গর্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা এবং অবহেলাজনিত মৃত্যুর সম্ভাবনা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনাস্থলে ফৌজদারি দায়ের জন্য প্রাথমিক রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছে এবং গর্তের মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণ দায়িত্বের ওপর তদন্ত চালু রয়েছে।
অধিক তদন্তে গর্তের চারপাশে অবৈধভাবে গড়ে তোলা কাঠামো, অপ্রয়োজনীয় গাছপালা এবং নিরাপত্তা চিহ্নের অভাবের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া, আশ্রয় প্রকল্পের পরিকল্পনা ও নির্মাণ সংক্রান্ত দায়িত্বশীল সংস্থার কাছ থেকে নিরাপত্তা মানদণ্ডের প্রয়োগের পর্যালোচনা চাওয়া হয়েছে।
স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ গর্তে শ্বাসরুদ্ধের ফলে শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধে টিউব‑ওয়েল গর্তের নিরাপদ কাভারিং ও সতর্কতা চিহ্ন স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে।
এই দুঃখজনক ঘটনার পর, স্থানীয় সরকার ও সামাজিক সংস্থাগুলি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও মানসিক পরামর্শ প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে, আশ্রয় প্রকল্পের অধীনে নির্মিত বাড়িগুলোর আশেপাশে অবস্থিত পুরনো গর্ত ও কূপের নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য জরুরি কর্মসূচি চালু করা হবে।
এই ঘটনা শিশু সুরক্ষা ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব পুনরায় তুলে ধরেছে। কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ ও সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ভবিষ্যতে অনুরূপ ট্র্যাজেডি রোধে মূল ভূমিকা রাখবে।



