COP30 সমাপনী অনুষ্ঠানের তৃতীয় সপ্তাহে সমৃদ্ধ দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক দক্ষিণের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বার্ষিক ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার তহবিল প্রদান করার প্রতিশ্রুতি জানায়। একই সময়ে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে “বাণিজ্য সমন্বয়” নামে একটি নতুন নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার দাবি করা হচ্ছে। এই নীতি ও জলবায়ু তহবিলের লক্ষ্যকে পশ্চিমা দেশগুলো দ্বিমুখী কৌশল হিসেবে সমালোচনা করা হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রশাসন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের শর্ত হিসেবে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চাপ দেয়। বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে, ২০২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ৬.১ বিলিয়ন ডলার রেকর্ড করা হয়েছে। এই পার্থক্য মূলত বাংলাদেশ রেডি‑মেড গার্মেন্টস রপ্তানি করে ডলার অর্জন করে, যা ১.৭৫ কোটি মানুষের মৌলিক পণ্য আমদানি করতে ব্যবহার হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও অনুরূপ চাহিদা প্রকাশ পায়। গত বছরের প্রথম দিকের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আয়োজনে অনুষ্ঠিত একটি সংলাপে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা বাংলাদেশকে ইউরোপীয় বাজার থেকে আরও বেশি পণ্য আমদানি করতে উৎসাহিত করেন, যাতে উভয় পক্ষের জন্য “পারস্পরিক সুবিধা” নিশ্চিত হয়। এই আহ্বান বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠনকে লক্ষ্য করে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রচেষ্টা এখন নিম্ন মজুরি শ্রমিকদের অধিকার থেকে সরিয়ে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের কাঠামোগত সমন্বয়ে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। রেডি‑মেড গার্মেন্টস শিল্পে বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখা হয়েছে, যদিও এই সুবিধা মূলত সমৃদ্ধ দেশের ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম কমাতে সহায়তা করেছে।
গ্লোবালাইজেশনের প্রাথমিক ধাপগুলোতে ধনী দেশগুলো উৎপাদন খরচ কমাতে উৎপাদন ক্ষমতা কম উন্নত দেশগুলোতে স্থানান্তরিত করেছিল। ফলে সমৃদ্ধ দেশের ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে রপ্তানিকৃত পণ্যের উৎপাদনকারী দেশগুলোর শ্রমিকরা এখনও ন্যূনতম জীবিকা অর্জনে সংগ্রাম করছেন। বাংলাদেশে রেডি‑মেড গার্মেন্টস কারখানার কর্মীরা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা পূরণে উচ্চ উৎপাদনশীলতা বজায় রাখলেও, বেতন স্তর এখনও জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণে অপর্যাপ্ত।
বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপে রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্যকরণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি এই চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা দেখা দেয়, তবে রপ্তানি আয় হ্রাস পেতে পারে এবং ডলার সংগ্রহে কঠিনতা বাড়তে পারে, যা সরাসরি আমদানি খরচ এবং মুদ্রা বাজারে চাপ সৃষ্টি করবে।
অন্যদিকে, জলবায়ু তহবিলের শর্ত হিসেবে গৃহীত অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত লক্ষ্যগুলোও বাংলাদেশের শিল্প নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তহবিলের প্রবাহ যদি নির্দিষ্ট গ্রীন টেকনোলজি গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তবে গার্মেন্টস শিল্পকে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নবায়নযোগ্য শক্তি ও কম কার্বন নির্গমন প্রযুক্তি গ্রহণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি কৌশলকে উচ্চ মানের পণ্য, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিংয়ে স্থানান্তরিত করা প্রয়োজন। এভাবে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং একইসাথে শ্রমিকদের বেতন উন্নত করা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি ও জলবায়ু তহবিলের দ্বিমুখী চাপে বাংলাদেশকে রপ্তানি-নির্ভর মডেল থেকে মূল্য সংযোজন ও টেকসই উৎপাদন মডেলে রূপান্তরিত হতে হবে। এই পরিবর্তন না হলে বাজার শেয়ার হারানোর ঝুঁকি এবং মুদ্রা উদ্বৃত্ত হ্রাসের সম্ভাবনা বাড়বে।



