জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত কমিটি ফ্ল্যাট ও জমির নিবন্ধন ফি অর্ধেক কমানোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এই সুপারিশের ভিত্তিতে সম্পত্তি ক্রয়‑বিক্রয়ের সময় সরকারী ফি হ্রাস পাবে, যা রিয়েল‑ইস্টেট বাজারে লেনদেনের খরচ কমাতে সহায়ক হবে।
বর্তমানে ঢাকা মহানগরে জমি, প্লট এবং ফ্ল্যাটের নিবন্ধন খরচ মোট সম্পদের ১২.৫ শতাংশের কাছাকাছি। উদাহরণস্বরূপ, এক কোটি টাকার সম্পত্তি নিবন্ধনের জন্য প্রায় বারো লাখ পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। কমিটি এই হারকে অর্ধেক করে ৬.২৫ শতাংশে নামানোর দাবি করেছে।
কমিটির নেতৃত্ব পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার দিচ্ছেন। গত মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে উপরে উল্লেখিত ছাড়ের পাশাপাশি অন্যান্য কর‑সংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রস্তাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল সম্পত্তি উপহারের ওপর ১ শতাংশ হারে কর আরোপের ধারণা। বাজারমূল্যের ভিত্তিতে এই কর ধার্য করা হলে, পরিবারিক বা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরে কোনো কর না বসার বর্তমান অবস্থা পরিবর্তিত হবে।
এ পর্যন্ত মা‑বাবা, স্ত্রী‑সন্তান, ভাই‑বোন ইত্যাদির মধ্যে সম্পত্তি বা নগদ উপহার দিলে কর আরোপের কোনো বিধান নেই। কমিটি এই শূন্যতা দূর করে করভিত্তি বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়েছে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) মন্তব্যে উল্লেখ করেছেন, এই সুপারিশগুলো বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বিবেচনা করা হবে। তিনি আরও জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বৃহৎ পরিসরের সংস্কার চালিয়ে যাচ্ছে, ফলে এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বাড়ছে।
নিবন্ধন করের বর্তমান হারও প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে জমি ও ফ্ল্যাটের নিবন্ধনে ৫ শতাংশ, অন্যান্য সিটি করপোরেশনে ৩ শতাংশ এবং পৌরসভা পর্যায়ে ২ শতাংশ ধার্য হয়। এই হারগুলোকে কমাতে সুপারিশ করা হয়েছে।
ব্যাংকে থাকা নগদের ওপর স্ট্যাম্প শুল্ক (আবগারি শুল্ক) সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রস্তাবিত হয়েছে। বর্তমানে ৩ লাখ টাকার বেশি ব্যালেন্সে ন্যূনতম ১৫০ টাকা শুল্ক আরোপিত হয়, এবং ১০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকার মধ্যে ব্যালেন্সে ৩ হাজার টাকা শুল্ক ধার্য হয়। কমিটি এই সীমা বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত শুল্ক মওকুফের দাবি করেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যাংক গ্রাহকের এক বছরের মধ্যে একবারই ৩ লাখ টাকার উপরে ব্যালেন্স থাকে, তবে শুল্ক একবারই আরোপিত হয়। নতুন সীমা নির্ধারিত হলে, ১০ লাখ টাকার নিচে থাকা ব্যালেন্সে কোনো শুল্ক আর না বসে, যা সঞ্চয়কারী গোষ্ঠীর জন্য আর্থিক স্বস্তি এনে দেবে।
ই‑কমার্স ক্ষেত্রেও কর নীতি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা ছোট ব্যবসায়িকদেরকে করের আওতায় আনার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে অনলাইন বাণিজ্যের আয়কর সংগ্রহ বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
কমিটি উল্লেখ করেছে যে, ফ্ল্যাট‑প্লটের নিবন্ধন ফি হ্রাস, উপহার কর প্রবর্তন, স্ট্যাম্প শুল্কের সীমা বৃদ্ধি এবং ই‑কমার্সে কর আরোপ—all together—একটি সমন্বিত কর সংস্কার পরিকল্পনা গঠন করে, যা রিয়েল‑ইস্টেট, সঞ্চয় এবং ডিজিটাল বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকরী কর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
এই সুপারিশগুলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পর্যালোচনা করা হবে। বাস্তবায়নের সময়সূচি ও নির্দিষ্ট বিধান এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো বাজারের লিকুইডিটি বাড়িয়ে বিনিয়োগের পরিবেশকে উজ্জীবিত করার সম্ভাবনা রাখে।
সারসংক্ষেপে, ফ্ল্যাট ও জমির নিবন্ধন ফি অর্ধেক কমানো, উপহার কর ১ শতাংশ নির্ধারণ, স্ট্যাম্প শুল্কের ছাড় এবং ই‑কমার্সে কর আরোপের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর কাঠামোকে আধুনিকায়ন ও ন্যায়সঙ্গত করার লক্ষ্য স্পষ্ট। এই সংস্কারগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে, করভিত্তি বিস্তৃত হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।



