ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে একত্রিত হয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। এই প্রস্তাবটি ইরানের অভ্যন্তরীণ অশান্তি এবং রাশিয়ার সামরিক সহায়তার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে। সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণের জন্য পরবর্তী সপ্তাহে অতিরিক্ত সভা নির্ধারিত হয়েছে।
আইআরজিসি ইরানের প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে কাজ করে, যা সশস্ত্র বাহিনী, বেসামরিক নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি সমন্বয় করে। প্রতিষ্ঠানটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, সাইবার অপারেশন এবং তেল-গ্যাস শিল্পে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে আসে। এ সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিরোধী গোষ্ঠীর দমন এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সামরিক হস্তক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত।
ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চপর্যায়ের কূটনীতিকরা আইআরজিসির তালিকাভুক্তি নিয়ে তীব্র মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছেন। বেশিরভাগ দেশ এই পদক্ষেপকে ইরানের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছে। তবে, কিছু দেশ এখনও সতর্কতা বজায় রেখেছে, যা বৈঠকের আলোচনায় জটিলতা যোগ করেছে।
প্রাথমিকভাবে ফ্রান্স, ইতালি এবং স্পেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউই দেশগুলো আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী তালিকায় যুক্ত করার বিরোধিতা করেছিল। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, এই দেশগুলো এখন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে তালিকাভুক্তির পক্ষে মত প্রকাশ করেছে। পরিবর্তনের পেছনে ইরানের গৃহযুদ্ধ দমন এবং রাশিয়ার সামরিক সহায়তার অভিযোগের প্রতি ইউরোপীয় নেতাদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো তেহরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সমন্বয়কে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আইআরজিসিকে কালো তালিকায় যুক্ত করা আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তদুপরি, ইউই সদস্য দেশগুলো এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের নীতি পরিবর্তনের জন্য প্রণোদনা তৈরি করতে চায়।
ইরান সরকার এই সম্ভাব্য ইউই সিদ্ধান্তের প্রতি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সতর্ক করেছে যে, আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হলে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীরাও সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচিত হবে। তেহরান এই হুমকি পূর্বে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইআরজিসি তালিকাভুক্তির পরেও পুনরায় প্রকাশ করেছিল। এই ধরনের প্রতিক্রিয়া ইরানের কূটনৈতিক অবস্থানকে কঠোর করে তুলেছে।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যার ফলে তেহরান মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডকে সন্ত্রাসী সংস্থা হিসেবে সম্বোধন করেছিল। এই ঘটনাটি ইরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছিল এবং অন্যান্য দেশগুলোর নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে।
কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইসরায়েল ইতিমধ্যে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা নীতি ও বিদেশী মিশনকে রক্ষা করার জন্য আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত আর্থিক ও সামরিক লেনদেন সীমাবদ্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। ইউই-র সম্ভাব্য তালিকাভুক্তি এই দেশগুলোর নীতি সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই আলোচনার ফলাফল ইরান-ইউই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গঠন করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। যদি আইআরজিসি তালিকাভুক্তি চূড়ান্ত হয়, তবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন, তেল রপ্তানি এবং কূটনৈতিক সংলাপের ওপর কঠোর শর্ত আরোপিত হতে পারে। পরবর্তী সপ্তাহে ব্রাসেলসে নির্ধারিত অতিরিক্ত বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক আচরণকে পুনরায় মূল্যায়নের সূচনা হতে পারে। তেহরানের সতর্কতা এবং পূর্বের যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্তি উভয়ই এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নীতির ওপর প্রভাব ফেলবে।



