ভারত ও রাশিয়া আগামী ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ বঙ্গোপসাগরে যৌথ নৌ মহড়া পরিচালনা করবে। “মিলান ২০২৬ নাভাল এক্সারসাইজ” নামে পরিচিত এই কার্যক্রমে দুই দেশের নৌবাহিনী অংশ নেবে, যেখানে রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফ্লিটের ফ্রিগেট মার্শাল শাপোশনিকভ এবং অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ যুক্ত হবে।
মিলান ২০২৬-এ রাশিয়ার ফ্রিগেট মার্শাল শাপোশনিকভের পাশাপাশি আধুনিক রণতরী সমুদ্র থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও সাবমেরিন‑বিধ্বংসী গাইডেড মিসাইল নিক্ষেপের সক্ষমতা সম্পন্ন জাহাজগুলোও অংশ নেবে। রাশিয়ার মেরিটাইম বোর্ডের বিবরণে বলা হয়েছে, এই জাহাজগুলো সমুদ্রের বিস্তৃত এলাকা পর্যবেক্ষণ ও শত্রু নৌবাহিনীর ওপর নির্ভুল আক্রমণ চালাতে সক্ষম।
মার্শাল শাপোশনিকভ ইতিমধ্যে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হয়েছে। বুধবার ওমানের রাজধানী মাস্কাটের বন্দর অতিক্রম করার পর জাহাজটি ভারতীয় উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়েছে। মহড়া সমাপ্তির পর রাশিয়ান নৌবাহিনীর এই জাহাজটি তামিলনাড়ু রাজ্যের বিশাখাপত্তম বন্দরে পৌঁছাবে বলে জানানো হয়েছে, যার প্রত্যাশিত সময়সীমা ১৮ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি।
এই নৌ মহড়া পরিকল্পনা প্রায় তিন মাস আগে ভারতীয় নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে নৌবাহিনীর ভাইস চিফ অ্যাডমিরাল সঞ্জয় বাৎসায়ন এই উদ্যোগের তথ্য জানিয়ে ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত ও রাশিয়া দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে সমুদ্র নিরাপত্তা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় কার্যক্রমে সমন্বয় বাড়াতে চায়।
ভারত‑রাশিয়া সামরিক সহযোগিতার পটভূমিতে ২০২৪ সালে স্বাক্ষরিত বহু সমঝোতা চুক্তি রয়েছে, যার মধ্যে যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সমুদ্র নিরাপত্তা সম্পর্কিত সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত। এই মহড়া উভয় দেশের নৌবাহিনীর আন্তঃপরিচালনা ক্ষমতা পরীক্ষা করার পাশাপাশি ইন্ডো‑প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের কৌশলগত উপস্থিতি দৃঢ় করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, বঙ্গোপসাগরে এই যৌথ মহড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তারা বলেন, ভারত ও রাশিয়া সমুদ্রের বহুমুখী হুমকি, যেমন সন্ত্রাসবাদী সাগরীয় কার্যক্রম ও অবৈধ মাছ ধরা, মোকাবিলায় সমন্বিত প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এছাড়া, এই মহড়া চীন-ভিত্তিক সামুদ্রিক প্রভাবের প্রতিক্রিয়ায় দুই দেশের কৌশলগত সমন্বয়কে শক্তিশালী করবে।
মিলান ২০২৬-এ অংশগ্রহণকারী রুশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলো ইতিমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরে নিয়মিত টহল চালায়। তাদের উপস্থিতি বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ দেবে। একই সঙ্গে, ভারতীয় নৌবাহিনীও তার আধুনিকীকরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন জাহাজ ও উপকরণ ব্যবহার করে এই মহড়ায় অংশ নেবে।
মহড়া শেষের পর রাশিয়ার ফ্রিগেট বিশাখাপত্তমে পৌঁছানোর পর দুই দেশের নৌকর্মী একত্রে সমুদ্র নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবে। এই ধরনের সমন্বিত প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সমুদ্রিক সংঘর্ষের প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে, ভারত ও রাশিয়া পরবর্তী মাসে সমুদ্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত উচ্চস্তরের বৈঠক আয়োজনের কথা বিবেচনা করছে। এই বৈঠকে মহড়া থেকে প্রাপ্ত শিখন, যৌথ অপারেশনাল প্রোটোকল এবং ভবিষ্যৎ যৌথ প্রশিক্ষণের সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া, ইন্ডো‑প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাও চালু থাকবে।
মিলান ২০২৬ নৌ মহড়া, ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্বের একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি কেবল দু’দেশের সামরিক সমন্বয়কে শক্তিশালী করবে না, বরং বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা পরিবেশকে স্থিতিশীল করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।



