বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)কে রেগুলেটর ও অপারেটর দুটো স্বতন্ত্র সংস্থায় ভাগ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার বুধবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একটি সরকারি পত্রের মাধ্যমে জানিয়েছে। সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য স্বার্থের সংঘাত দূর করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেবা নিশ্চিত করা।
মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বেবিচক অতীত থেকে উভয় রেগুলেটরি ও অপারেটিভ ভূমিকা একসঙ্গে পালন করে আসছে। রেগুলেটর হিসেবে এটি বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা তদারকি করে, আর অপারেটর হিসেবে এয়ার নেভিগেশন সেবা প্রদান এবং বিমানবন্দর পরিচালনা করে।
একই সংস্থার মধ্যে এই দু’টি কাজ একসঙ্গে থাকলে রেগুলেটরি সিদ্ধান্তে অপারেটরের স্বার্থ প্রভাবিত করতে পারে, এ কারণেই সরকার স্বার্থসংঘাতের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রেগুলেটর ও অপারেটরকে আলাদা করা প্রয়োজনীয় বলে গণ্য করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) পরিচালিত সাম্প্রতিক অডিটে বেবিচকের এই দ্বৈত সত্তা পৃথক করার সুপারিশ করা হয়েছিল। অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বতন্ত্র রেগুলেটরি সংস্থা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রাখতে সহায়ক হবে, আর অপারেটিভ সংস্থা সেবার গুণগত মান উন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারবে।
এছাড়া, গত বছরের ১৮ অক্টোবর ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদেও বেবিচকের রেগুলেটর ও অপারেটর সত্তা আলাদা করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কমিটি উল্লেখ করেছে, দু’টি সত্তা একসঙ্গে থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকার অতি শীঘ্রই প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন বা সংশোধনের মাধ্যমে পৃথক অপারেটর সংস্থা গঠন করবে। নতুন অপারেটর সংস্থা এয়ার নেভিগেশন সেবা এবং বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব নেবে, আর রেগুলেটরি সংস্থা নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের কাজ চালিয়ে যাবে।
এই কাঠামোগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণে সহায়তা করবে বলে সরকার আশাবাদী। রেগুলেটরি ও অপারেটিভ কাজের স্পষ্ট বিভাজন সেবার মানোন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিমান শিল্পের কিছু বিশ্লেষক পূর্বে সরকারি ব্যুরোক্রেসির অতিরিক্ত জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতেন। তারা উল্লেখ করেন, একক সংস্থার অধীনে কাজ করলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি এবং স্বার্থের টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে। নতুন কাঠামো এই সমস্যাগুলো কমিয়ে কার্যকরী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, বেবিচকের কিছু কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, সংস্থার পুনর্গঠন কর্মসংস্থান ও কর্মপ্রবাহে অস্থায়ী ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে, তাই যথাযথ পরিকল্পনা ও কর্মী পুনঃপ্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুনর্গঠনের সময় কর্মীদের অধিকার রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। নতুন সংস্থার কাঠামো গঠনের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হবে।
বিভাজনের পর, রেগুলেটরি সংস্থা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি নির্ধারণে বেশি স্বতন্ত্র হবে, আর অপারেটর সংস্থা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সেবা উন্নয়নে মনোযোগ দেবে। উভয় সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে বেসামরিক বিমান চলাচলের সামগ্রিক গুণগত মান উন্নত হবে, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত হবে এবং দেশের এয়ার ট্র্যাফিক ম্যানেজমেন্টে আধুনিক প্রযুক্তি ও পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগ বাড়বে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস প্রকাশ করেছে।



