বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ পুনরাবৃত্তি ঘটছে, বিশেষ করে শীতকালে, এবং প্রতিবেশী ভারতের সাম্প্রতিক কেসগুলো উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ভাইরাসের উপস্থিতি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সরকার ও স্বাস্থ্য সংস্থা এখন দ্রুত স্ক্রিনিং ও সতর্কতা বাড়াচ্ছে।
প্রথম নিপাহ রোগের বিস্ফোরণ ২০০১ সালে রেকর্ড করা হয়, এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছর কিছু না কিছু কেস রিপোর্ট হয়েছে। শীতের মাসগুলোতে রোগের হার বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়, যা স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে ভাইরাসের সম্পর্ক নির্দেশ করে। তাই নিপাহকে আর কোনো বিদেশি রোগ নয়, বরং দেশের স্বাভাবিক রোগের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
ফলবাতের প্রজাতি, বিশেষ করে ফলগাছের আশেপাশে বসবাসকারী ফলবাত, নিপাহ ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। এই পাখির লালা ও মূত্রে ভাইরাসের উচ্চ ঘনত্ব থাকে, যা মানব সংক্রমণের প্রধান উৎস। ফলবাতের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে না আসলেও, তাদের দ্বারা দূষিত পরিবেশে রোগের ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশে মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে কাঁচা ডাঁটা পাম রসের মাধ্যমে সংক্রমণ। পাম গাছের রস সংগ্রহের সময় যদি পাত্রটি ঢাকনা না থাকে, তবে ফলবাতের লালা বা মূত্র রসে মিশে যায়। এই দূষিত রস সরাসরি পান করলে ভাইরাস দেহে প্রবেশ করে। তাই রসের নিরাপদ ব্যবহার রোগ প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।
রসের পাশাপাশি ফলবাতের ছোঁয়া পেয়েছে এমন ফল, বিশেষ করে আংশিক খাওয়া পাকা ফলও সংক্রমণের সম্ভাবনা রাখে। আক্রান্ত প্রাণীর মাংস বা রক্তের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে আসলে রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তাছাড়া, রোগীর লালা, শ্বাসের ফোঁটা, রক্ত বা মূত্রের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটতে পারে, যা পরিবার ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এই মানব-থেকে-মানব সংক্রমণ বিশেষ করে ঘরোয়া পরিবেশ ও হাসপাতালের মতো ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের স্থানে বেশি ঝুঁকি তৈরি করে। রোগীর যত্নে থাকা পরিবার সদস্য ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যথাযথ সুরক্ষা না নিলে ভাইরাসের বিস্তার সহজে ঘটতে পারে। তাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সঠিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য।
নিপাহ সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণ জ্বর, মাথাব্যথা, পেশীর ব্যথা, গলা ব্যথা এবং ক্লান্তি। এই উপসর্গগুলো ফ্লু বা সাধারণ ভাইরাল জ্বরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে পারে, ফলে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক শনাক্তকরণ কঠিন হয়। রোগীর অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে, তাই সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ পরীক্ষা করা উচিত।
গুরুতর ক্ষেত্রে ভাইরাস মস্তিষ্কে আক্রমণ করে এনসেফালাইটিস সৃষ্টি করে। রোগীর মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট এবং চেতনা হারানোর মতো উপসর্গ দ্রুত বাড়ে। রোগের অগ্রগতি কয়েক দিনের মধ্যে ঘটতে পারে, যা চিকিৎসা সংস্থার জন্য চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি তৈরি করে।
দক্ষিণ এশিয়ায় নিপাহ রোগের মৃত্যুহার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যে রেকর্ড হয়েছে। অর্থাৎ, সংক্রমিত রোগীর অর্ধেকের বেশি সময়ে রোগটি প্রাণঘাতী হতে পারে। রোগের তীব্রতা ও রোগীর বয়স, স্বাস্থ্যের অবস্থা অনুযায়ী মৃত্যুহার পরিবর্তিত হয়, তবে সামগ্রিকভাবে এটি একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগ।
বেঁচে থাকা রোগীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী স্নায়ুবিক সমস্যার সম্ভাবনা থাকে। স্মৃতিভ্রংশ, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন এবং মনোযোগের ঘাটতি প্রায়শই দেখা যায়। এই পরিণতিগুলো রোগীর দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে এবং পুনর্বাসনের প্রয়োজন বাড়ায়।
এ পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের জন্য কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা টিকা পাওয়া যায়নি। চিকিৎসা মূলত সমর্থনমূলক, যেখানে শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা, জ্বর কমানো এবং জটিলতা নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তবে রোগের মূল কারণ দূর করা সম্ভব না হওয়ায় প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকর পদ্ধতি।
কাঁচা ডাঁটা পাম রসের ব্যবহার এড়িয়ে চলা সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। রস সংগ্রহের সময় পাত্রটি সঠিকভাবে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখলে ফলবাতের দূষণ কমে যায়। রসকে ফুটিয়ে নিলে ভাইরাস ধ্বংস হয়, ফলে নিরাপদভাবে পান করা যায়।
ফলবাতের ছোঁয়া পেয়েছে এমন ফল, বিশেষ করে আংশিক খাওয়া পাকা ফল, খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। তাজা ফলের ক্ষেত্রে পরিষ্কার করে ধুয়ে নেয়া এবং সম্পূর্ণভাবে খাওয়া নিরাপদ। এছাড়া, পোষা প্রাণী বা বন্য প্রাণীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা জরুরি।
যদি কোনো ব্যক্তি নিপাহ রোগে আক্রান্ত হয়, তবে যত দ্রুত সম্ভব আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগীর যত্নে থাকা পরিবার সদস্য ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মুখোশ, গ্লাভস এবং সুরক্ষামূলক চশমা ব্যবহার করা উচিত। হাত ধোয়া ও শারীরিক সংস্পর্শ কমিয়ে রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব।
সামগ্রিকভাবে, নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্তরে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। রসের নিরাপদ ব্যবহার, ফলের সঠিক সংরক্ষণ এবং সংক্রমিত রোগীর সঠিক আলাদা করা এই রোগের বিস্তার সীমিত করতে সহায়ক হবে। আপনি কি আপনার বাড়িতে রসের সংগ্রহের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করতে প্রস্তুত?



