চীন সরকারের অধীনস্থ একটি আদালত গত সপ্তাহে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী লাউক্কাই শহরে কার্যকরী স্ক্যাম গোষ্ঠী মিং পরিবারের ১১ জন সদস্যকে মৃত্যুদণ্ডে ফাঁসিয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি সেপ্টেম্বর মাসে ঝেজিয়াং প্রদেশের একটি নিম্ন আদালতে দেওয়া মূল দণ্ডের আপিল প্রত্যাখ্যানের পর সর্বোচ্চ আদালতে নিশ্চিত করা হয়।
ঝেজিয়াং প্রদেশের আদালত মূলত মিং পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড, অবৈধ আটক, প্রতারণা এবং জুয়া ঘাঁটি পরিচালনার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। নভেম্বর মাসে চীনের সর্বোচ্চ আদালত তাদের আপিল প্রত্যাখ্যান করে দণ্ডকে চূড়ান্ত করে দেয়।
মিং পরিবার লাউক্কাই শহরে বহু বছর ধরে অনলাইন স্ক্যাম, মানব পাচার, মাদক ব্যবসা এবং ক্যাসিনো‑ভিত্তিক জুয়া ঘাঁটি পরিচালনা করে আসছে। এই শহরটি পূর্বে শান্ত ও বিচ্ছিন্ন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল, তবে মাফিয়া গোষ্ঠীর কার্যক্রমের ফলে তা একধরনের অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
লাউক্কাই চীন‑মিয়ানমার সীমান্তের কাছে অবস্থিত কোকাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে রয়েছে, যেখানে কোকাং জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই চীন বংশোদ্ভূত। ২০২৩ সালে চলমান গৃহযুদ্ধের পর এই অঞ্চলটি বিদ্রোহী জোটের অধীনে চলে যায়, যার মধ্যে মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক আলায়েন্স (এমএনডিএএ) শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
এমএনডিএএর নিয়ন্ত্রণে থাকা গোষ্ঠী মিং পরিবারের ১১ জনকে গ্রেফতার করে চীনের হাতে হস্তান্তর করে। চীনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এই গ্রেফতার কাজটি সম্পন্ন হয়, যা মাফিয়া গোষ্ঠীর ওপর চাপ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বিবিসি সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে মিং গোষ্ঠীর স্ক্যাম নেটওয়ার্কের শিকার হয়ে হাজারো চীনা কর্মী আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে। মানব পাচারের মাধ্যমে এখানে আনা কয়েক লক্ষ মানুষের মধ্যে মাত্র কয়েক হাজারই সরাসরি স্ক্যাম কার্যক্রমে জড়িত ছিল।
গত বছর চীনের ইন্টারনেট জগতে এক চীনা অভিনেতার নামের সঙ্গে যুক্ত একটি ভাইরাল ঘটনা ঘটেছিল। তিনি থাইল্যান্ডে চুক্তিভিত্তিক কাজের জন্য গিয়েছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের লাউক্কাইতে অবস্থিত স্ক্যাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এই ঘটনা চীনের জনমতকে আরও উত্তেজিত করে তুলেছিল।
বেইজিং এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে এবং মিয়ানমার জান্তা সরকারকে স্ক্যাম মাফিয়া গোষ্ঠীর ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে বহুবার চাপ দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় জাতিগত সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে জান্তা বাহিনীর তীব্র লড়াইয়ের পর লাউক্কাইতে মাফিয়া গোষ্ঠীর পতন ঘটেছে।
চীনের সর্বোচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মিং গোষ্ঠী স্ক্যাম ও জুয়া ঘাঁটি পরিচালনা করে মোট ১৪০ কোটি ডলারেরও বেশি আয় করেছে। এই অপরাধের শিকার হয়ে ১৪ জন চীনা নাগরিকের মৃত্যু ঘটেছে, আর অসংখ্য মানুষ শারীরিক ও মানসিক আঘাত পেয়েছে।
মিং পরিবারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় চীন সরকার স্ক্যাম নেটওয়ার্কের ওপর আরও কঠোর নজরদারি চালু করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থা ভবিষ্যতে একই রকম অপরাধমূলক গোষ্ঠীর ওপর তদন্ত বিস্তৃত করতে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করতে কাজ করবে।
এই ঘটনার পর চীনের আইনি বিভাগে অতিরিক্ত তদন্তের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে স্ক্যাম নেটওয়ার্কের অন্যান্য সহায়ক গোষ্ঠী ও আর্থিক প্রবাহের উৎস সনাক্ত করা যায়। এছাড়া, মিয়ানমার সরকারকে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আহ্বান করা হয়েছে।
মিং গোষ্ঠীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া চীন‑মিয়ানমার সীমান্তে অবৈধ স্ক্যাম কার্যক্রমের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে একই ধরণের অপরাধ রোধে উভয় দেশের আইনগত ও নিরাপত্তা কাঠামোর সমন্বয় অব্যাহত থাকবে।



