পঞ্চগড়ের নুসরাত জাহান নুহা, ২০২০ সালে অষ্টম শ্রেণিতে হাড়ের ক্যানসার (অস্টিওসারকোমা) নির্ণয় হওয়ার পরেও ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন এবং ২০২৫‑২৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ১০০তম স্থান অর্জন করেছেন।
শৈশবে সাইকেল চালানো, গাছে চড়া এবং মাঠে দৌড়ানোর মতো স্বাভাবিক শিশুকালের আনন্দে ভরা নুহার জীবন, হাড়ের টিউমার ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে যায়। রোগের অগ্রগতি ও কেমোথেরাপির তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তাকে শারীরিকভাবে সীমাবদ্ধ করে, ফলে সাঁতার বা কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ডায়াগনসিসের পরপরই নুহা কেমোথেরাপি শুরু করেন। চিকিৎসা চলাকালে ডান পায়ের টিবিয়া হাড় অপসারণের প্রয়োজন হয় এবং সেখানে প্রস্থেটিক ডিভাইস বসানো হয়। ফলে এক পা অন্যের তুলনায় কিছুটা লম্বা হয়েছে এবং ডান হাতে ক্রাচ ব্যবহার করে চলতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি কোনো বড় আঘাত এড়িয়ে চলেন, নতুবা হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হতে পারে।
ক্যানসার চিকিৎসা ও ফলো‑আপের কারণে নিয়মিত পাঠে বাধা সত্ত্বেও নুহা শিক্ষায় কোনো বিরতি দেননি। কোভিড‑১৯ মহামারির সময় অটোপাসের সুবিধা নিয়ে অষ্টম শ্রেণি শেষ করেন, ফলে একাডেমিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। পরবর্তীতে তিনি এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জন করেন, যেখানে বোর্ডে ১৭তম স্থান অর্জন করেন।
২০২৫‑২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় নুহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিট এবং ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে একসাথে ১০০তম র্যাঙ্ক পেয়ে ভর্তি হন। এই র্যাঙ্কটি তার কঠোর পরিশ্রম ও রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের ফলাফল হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য নুহা গত মঙ্গলবার পঞ্চগড় থেকে বাসে করে ঢাকা যান। রাত আটটায় তিনি ঢাকায় পৌঁছে একা ভর্তি অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। ভ্রমণের সময় তিনি ফোনে নিজের সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো জরুরি সমস্যার কথা উল্লেখ করেন না।
ঢাকায় পৌঁছানোর পর নুহা জানান যে, ডান পায়ের হাড় অপসারণের পরেও তাকে পা কেটে ফেলতে হয়নি; তবে প্রস্থেটিক ডিভাইসের কারণে এক পা অন্যের তুলনায় বড় এবং অন্য পা ছোট। তিনি ক্রাচের সাহায্যে চলাফেরা করেন এবং কোনো বড় আঘাত এড়াতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন।
নুহা রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় যে মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন, তা তিনি নিজের কথায় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, পরিবারে সবাই তার পরিবর্তন লক্ষ্য করলেও ক্যানসার রোগের প্রকৃত মাত্রা বুঝতে সময় লেগেছিল। কেমোথেরাপির এক ধাপ শেষ হলে তিনি সুস্থতার দিন কাছাকাছি আসবে বলে আশা করতেন, যদিও বাস্তবে তা দীর্ঘ সময়ের পরই স্পষ্ট হয়।
নুহার গল্প শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শক্তিশালী উদাহরণ। রোগের কারণে শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও লক্ষ্য স্থির রেখে ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। তার অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, স্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জের মুখে মানসিক দৃঢ়তা ও সঠিক পরিকল্পনা সফলতার চাবিকাঠি।
শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক টিপস: রোগ বা অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত বাধা আসলে সময়মতো চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করুন, শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অনলাইন বা দূরশিক্ষা বিকল্প ব্যবহার করুন, এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য ছোট ছোট ধাপের পরিকল্পনা করে অগ্রসর হন।



