চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তির বৈধতা নিয়ে দায়ের রিটের ওপর হাইকোর্ট আজ রুল ডিসচার্জের রায় দিয়েছে। একক হাইকোর্ট বেঞ্চের বিচারপতি জাফর আহমেদ রুল ডিসচার্জ ঘোষণা করে রিটকে খারিজ করেছেন, ফলে রিটের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় চূড়ান্ত হয়েছে। রিটের আবেদনকারী আপিল বিভাগে রায়ের স্থগিত চেয়ে আপিল করেছে।
রিটের ওপর গত বছর ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে বিভক্ত রায় হয়। জ্যেষ্ঠ বিচারপতি রুল অ্যাবসলিউট ঘোষণা করেন, অন্য বিচারপতি রুল ডিসচার্জের রায় দেন। এরপর প্রধান বিচারপতি ১৫ ডিসেম্বর রিটটি বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠান। আজ শোনানির পর একক বেঞ্চ রুল ডিসচার্জের রায় প্রদান করে।
বিচারিক রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে দুবাই সরকারের অধীনে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে গৃহীত সরকারি‑বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) চুক্তি আইনগতভাবে বৈধ। রায়ে বলা হয়েছে যে চুক্তি ২০১৭ সালের প্রোকিউরমেন্ট পলিসি ও সমঝোতা স্মারকের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে সরাসরি বাছাই ও দরপত্র উভয়ের সুযোগ রয়েছে। আইনগত দৃষ্টিতে কোনো চ্যালেঞ্জ উপস্থাপিত হয়নি এবং কোনো কার্যাদেশ জারি করা হয়নি।
শুনানিতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও সৈয়দ মামুন মাহবুব উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেনও অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্বে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক শোনানিতে অংশ নেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে মো. হেলাল উদ্দিন চৌধুরী আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিমের পক্ষে আইনজীবী নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম শোনানিতে অংশ নেন।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে রুল ডিসচার্জের রায় এনসিটি প্রকল্পের কার্যক্রমে স্বল্পমেয়াদী ব্যাঘাত কমাবে বলে বিশ্লেষণ করা যায়। চুক্তি বৈধ বলে স্বীকৃত হওয়ায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে এবং টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এ ধরনের PPP মডেল চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে, বিশেষ করে কন্টেইনার লোডিং‑আনলোডিং দক্ষতা বাড়াতে।
অন্যদিকে, রিটের খারিজের ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইনি ভিত্তি নিশ্চিত হয়েছে। ২০১৭ সালের প্রোকিউরমেন্ট নীতিমালা অনুযায়ী সরাসরি বাছাই বা দরপত্রের ব্যবহার উভয়ই অনুমোদিত, তাই ভবিষ্যতে অনুরূপ চুক্তি গঠনের সময় আইনি চ্যালেঞ্জের ঝুঁকি কমবে। তবে রিটের আবেদনকারী আপিল বিভাগে রায়ের স্থগিত চেয়ে আপিল করার ফলে চূড়ান্ত রায়ের আগে কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে যাবে।
বাজারে এই রায়ের প্রভাব ইতিবাচকভাবে ধরা পড়বে বলে আশা করা যায়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চুক্তির আইনি বৈধতা নিশ্চিত হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর প্রকল্পে অতিরিক্ত মূলধন প্রবাহের সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে, বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে লজিস্টিক্স খাতে খরচ হ্রাস এবং পণ্য প্রবাহের গতি বাড়বে, যা রপ্তানি‑আমদানি ব্যবসায়িক সংস্থার জন্য উপকারী।
দীর্ঘমেয়াদে রুল ডিসচার্জের রায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে সরকারি‑বেসরকারি অংশীদারিত্বের কাঠামো পুনর্বিবেচনা না করে, বিদ্যমান চুক্তি অনুসারে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে। তবে আপিল বিভাগে রায়ের সম্ভাব্য পরিবর্তন প্রকল্পের সময়সূচি ও আর্থিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আপিলের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে কৌশলগত সমন্বয় করা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, হাইকোর্টের একক বেঞ্চ রুল ডিসচার্জের রায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের আইনি ভিত্তি দৃঢ় করেছে এবং বিদেশি অংশীদারিত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে। যদিও আপিল বিভাগে রায়ের স্থগিত চাওয়া হয়েছে, তবু বর্তমান রায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্বল্পমেয়াদী স্থিতিশীলতা প্রদান করবে এবং বন্দরকে আঞ্চলিক লজিস্টিক্স হাবের পথে অগ্রসর হতে সহায়তা করবে।



