১৫ জানুয়ারি, ভারতের সর্বোচ্চ আদালত একটি ১৫২ পৃষ্ঠার রায় দিয়ে টিগার গ্লোবালকে ২০১৮ সালে ফ্লিপকার্টের শেয়ার বিক্রয়ের ওপর ভারতীয় কর দিতে বাধ্য করেছে। এই রায় পূর্বে দিল্লি হাই কোর্টের ২০২৪ সালের সিদ্ধান্তকে উল্টে দেয়, যেখানে টিগার গ্লোবালকে ভারত‑মরিশাস ট্যাক্স চুক্তির অধীনে করমুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
টিগার গ্লোবাল, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিনিয়োগ সংস্থা, ২০১৮ সালে ওয়ালমার্টের মাধ্যমে ফ্লিপকার্টের ১৭% শেয়ার বিক্রি করে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১.১৯ বিলিয়ন পাউন্ড) আয় অর্জন করে। এই শেয়ারগুলো মারিশাসে নিবন্ধিত তিনটি সত্তার মাধ্যমে রাখা ছিল, যা তখন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে সাধারণ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সুপ্রিম কোর্টের রায় ট্যাক্স চুক্তির ব্যাখ্যাকে কঠোর করে, বিশেষ করে যখন অফশোর কাঠামোকে ‘শ্যাম’ বা বাণিজ্যিক দিক থেকে অপ্রাসঙ্গিক বলে বিবেচনা করা হয়। ফলে, ভবিষ্যতে কর কর্তৃপক্ষ কোনো বিদেশি বিনিয়োগের লেনদেনে চুক্তির সুবিধা অস্বীকার করতে পারে, যদিও সংশ্লিষ্ট দল যথাযথ নথিপত্র উপস্থাপন করে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের বাইরে থেকে বিনিয়োগকারী ও প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মগুলোতে উদ্বেগের স্রোত তৈরি হয়েছে। অনেক সংস্থা এখন তাদের আইনজীবী ও আর্থিক পরামর্শদাতার সঙ্গে পরামর্শ করে, পুরনো লেনদেনের পুনর্মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য কর ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে।
কিছু আইনজীবী, যাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি, জানান যে তাদের ক্লায়েন্টরা এই রায়ের পর পুরনো লেনদেন, বিশেষ করে শেয়ার বিক্রয়, পুনরায় পর্যালোচনা করতে বাধ্য বোধ করছেন। তারা উদ্বিগ্ন যে কর কর্তৃপক্ষ অতীতের লেনদেনেও হস্তক্ষেপ করতে পারে, যা আগে সম্পন্ন বলে ধরা হয়েছিল।
কেটান দালাল, কেটালিস্ট অ্যাডভাইজর্সের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, উল্লেখ করেন, “এই রায় কর কর্তৃপক্ষকে যে কোনো অফশোর কর্পোরেট লেনদেনের উপর নজরদারি করার সুযোগ দেয়, যা নীতিগত স্থিতিশীলতা ও ব্যবসায়িক নিশ্চিততাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।” তার মন্তব্যে দেখা যায়, বিনিয়োগের পরিবেশে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিদেশি মূলধনের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
টিগার গ্লোবালের মামলাটি ২০১৮ সালে ওয়ালমার্টের ফ্লিপকার্ট অধিগ্রহণের সময় একটি উল্লেখযোগ্য বিদেশি প্রস্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। তবে, কর সংক্রান্ত বিরোধের পর থেকে এটি দেশের অন্যতম নজরকাড়া ট্যাক্স মামলায় পরিণত হয়েছে। টিগার গ্লোবাল দাবি করেছিল যে তাদের লাভ ভারতীয় কর থেকে রক্ষা পেয়েছে, কারণ তারা মরিশাসের চুক্তির অধীনে করমুক্তি পেয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মূল বিষয় হল, কর সুবিধা পেতে হলে অফশোর সত্তাগুলোর বাণিজ্যিক বাস্তবতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে। নথিপত্রে যদি কেবল কাগজে থাকা শেয়ার বা শেয়ারহোল্ডার কাঠামো দেখানো হয়, তবে তা শ্যাম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগের কাঠামো গড়তে প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি এই রায়ের ভিত্তিতে কর কর্তৃপক্ষ অতীতের লেনদেনেও হস্তক্ষেপ করে, তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ভারতের বাজার থেকে দূরে সরে যেতে পারেন। ফলে, ই-কমার্স, ফিনটেক এবং অন্যান্য উচ্চ-প্রযুক্তি সেক্টরে নতুন মূলধন প্রবাহে বাধা আসতে পারে।
অন্যদিকে, ভারতীয় সরকার এই রায়কে দেশের করভিত্তি শক্তিশালী করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তারা দাবি করে, ট্যাক্স চুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং শ্যাম কাঠামোকে দমন করা দেশের আর্থিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার বাড়াবে।
সামগ্রিকভাবে, এই রায়ের প্রভাব কেবল টিগার গ্লোবাল ও ফ্লিপকার্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগের শর্ত, ট্যাক্স পরিকল্পনা এবং কর সংক্রান্ত ঝুঁকির মূল্যায়নে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে। বিনিয়োগকারীরা এখন আরও সতর্কভাবে অফশোর কাঠামো গড়ে তুলতে এবং নথিপত্রের বাণিজ্যিক বাস্তবতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই রায়ের পরবর্তী পর্যায়ে শেয়ার মূল্যের অস্থিরতা, বিদেশি মূলধনের প্রবাহের হ্রাস এবং নতুন ট্যাক্স নীতি গঠনের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশেষ করে, ই-কমার্স সেক্টরে বড় লেনদেনের ক্ষেত্রে ট্যাক্স পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, সুপ্রিম কোর্টের রায় ভারতীয় ট্যাক্স নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে, যা বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিনিয়োগকারী, আইনজীবী ও আর্থিক পরামর্শদাতাদের জন্য এখনই এই নতুন রায়ের প্রভাব বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি।



