ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর মাত্র এক সপ্তাহে, লালমনিরহাট-১ আসনের হাতীবান্ধা উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হিংসাত্মক মুখোমুখি দেখা দেয়। রোববারের ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ছয়জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।
একই দিনে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধারাবাহিক সংঘর্ষে কমপক্ষে ত্রিশজন আহত হয়। আহতদের মধ্যে গৃহহীন ও বয়স্ক মানুষও অন্তর্ভুক্ত, যা নির্বাচনী পরিবেশের অশান্তি বাড়িয়ে তুলেছে।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের আলমডাঙ্গা উপজেলায়ও একই রকমের হিংসা দেখা যায়। সেখানে বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামি প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে তেরজন আহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। আহতদের অবস্থা স্থিতিশীল, তবে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা-১৮ আসনে জাতীয় নাগরিক দল (NCP) এবং দশ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের জনসংযোগে হামলার পর দুইজন আহত হয়। ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম রোববারের এই ঘটনাগুলোর পর মন্তব্য করে জানান, “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণা কী, তা পরিষ্কার করা দরকার। ছোট অভিযোগ হলেও তা নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিতে আনতে হবে এবং বাস্তব ভিত্তি আছে কিনা তা যাচাই করতে হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “ইসির ভূমিকা নিরপেক্ষতা রক্ষা করা, রিটার্নিং অফিসার ও মাঠ প্রশাসনের কাজের তদারকি করা। এ সব কাজই কমিশনের দায়িত্ব।”
আলীমের কথায় ইসির ভূমিকা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগের প্রতি ইসির প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট হয়। তিনি উল্লেখ করেন, “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অভাবের অভিযোগ মানতে পারি না, কারণ আমরা ইতিমধ্যে পর্যবেক্ষণ ও তদারকি ব্যবস্থা চালু করেছি।” তবে তিনি দল ও প্রার্থীদের সহযোগিতা চেয়ে জানান, “নির্বাচন প্রক্রিয়া সুষ্ঠু রাখতে সকল পক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন।”
নাখোশ দলগুলো ইসির ওপর ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি না করার অভিযোগ তুলছে। তারা দাবি করে, নির্বাচনী তদন্ত কমিটিকে নির্দিষ্ট অভিযোগ জানাতে হবে, যাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। তবে ইসির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের নির্দেশনা এখনো প্রকাশিত হয়নি।
প্রশাসনিক দিক থেকে, রোববারের ঘটনাগুলোতে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিছু দল বলছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপ যথেষ্ট ছিল না, ফলে হিংসা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, ইসির প্রতিনিধিরা বলছেন, তারা মাঠে পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামি উভয়ই রোববারের ঘটনার জন্য দায়িত্ব স্বীকার করে না, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ও নির্বাচনী পরিবেশের অবনতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। উভয় দলই দাবি করে, ইসির তদারকি শক্তিশালী না হলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, নির্বাচনী সংঘর্ষের বৃদ্ধি ভোটের দিন পর্যন্ত দুই সপ্তাহ বাকি থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলবে। তারা সতর্ক করেন, যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ না হয়, তবে ভোটের পর ফলাফল নিয়ে বিরোধের সম্ভাবনা বাড়বে।
ইসির মন্তব্যের পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশনের অন্যান্য সদস্যদেরও একই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, “নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।” এছাড়া, তারা সকল দলকে অনুরোধ করেছেন, হিংসা না করে শান্তিপূর্ণ প্রচার চালাতে।
নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত কোনো কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি, তবে তারা বলেছে, “যদি কোনো দল বা প্রার্থী কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের প্রয়োজন মনে করে, তবে তা নির্দিষ্টভাবে জানাতে হবে।” এই নির্দেশনা অনুসরণে দলগুলোকে লিখিতভাবে অভিযোগ জমা দিতে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববারের ঘটনাগুলোতে আহতদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তা এখনও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগে জরুরি সেবা প্রদান করা হয়েছে, তবে রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পদ সীমিত হচ্ছে।
বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামি উভয়ই রোববারের ঘটনার পর তাদের সমর্থকদের শান্তি বজায় রাখতে আহ্বান জানিয়েছে। তবে উভয় দলের মধ্যে এখনও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ইসির মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, “নির্বাচনের সময়কালীন আচরণবিধি মেনে চলা প্রত্যেকের দায়িত্ব। ধর্মকে ভোটের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা নির্বাচন আইনের লঙ্ঘন হবে।” এই বক্তব্যের পরেও কিছু দল ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ব্যবহার করে ভোট সংগ্রহের অভিযোগে ইসির ওপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, রোববারের ঘটনাগুলো নির্বাচনী পরিবেশের অস্থিরতা প্রকাশ করে। ইসির তদারকি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দলগুলোর সহযোগিতা কীভাবে কাজ করবে, তা ভোটের দিন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়ে যাবে।
ভবিষ্যতে, নির্বাচন কমিশনকে সকল দলকে সমান সুযোগ প্রদান, হিংসা রোধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। তদুপরি, নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকরী উপস্থিতি এবং দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।



