ড. আহসান এইচ মনসুর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন যে, কিছু লোক টাকার বিনিময়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি জানান, এই ধরনের ভ্রান্ত তথ্য শীঘ্রই থেমে যাবে।
গুজবের মূল কারণ হল ব্যাংকের নতুন নীতি ও সুদের হার সম্পর্কে অজানা তথ্যের অপব্যবহার। গভর্নর জোর দিয়ে বলেন, ১ জানুয়ারি থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সব লেনদেন পুনরায় চালু করা হয়েছে এবং আমানতে সর্বোচ্চ ৯.৫ শতাংশ সুদ প্রদান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, একবারে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা সম্ভব।
ব্যাংকটি কেবল আমানতই নয়, ঋণগ্রহণের সুযোগও প্রদান করছে। গ্রাহকরা লোন নিলে মুনাফা উত্তোলন করতে পারবেন, যা শারিয়াহ কাউন্সিলের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হবে। তবে, রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে ব্যাংক গঠন রাতারাতি করা সম্ভব নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া।
শরিয়াহ কাউন্সিলের মতে, গত দুই বছরে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে মুনাফা বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে সরকার গ্রাহকের দুরঅবস্থা বিবেচনা করে ৪ শতাংশ সুদ প্রদান করছে, যা পূর্বের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।
পাঁচটি ব্যাংকের সামগ্রিক লোকসানের পরেও সরকার ৪ শতাংশ মুনাফা অনুদানের মাধ্যমে সরবরাহ করছে। এই অনুদানের মোট ব্যয় প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা, যা সরকারি বাজেটে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। তদুপরি, এনবিএফআই (ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান) ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নগদ জমা গ্রহণ করা হচ্ছে, যেখানে ব্যাংকের আমানতকারীদের সর্বোচ্চ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।
গভর্নর উল্লেখ করেন, ইসলামী আইন অনুযায়ী মুনাফা লাভের আকারে না, বরং অনুদানের মাধ্যমে প্রদান করা হয়, যা সরকারী ব্যয়ের বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। তিনি বলেন, পাঁচটি ব্যাংকের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়িত্ব সবারই, তবে শেষ দায়ভার সরকারই বহন করবে। সরকার প্রত্যাশার তুলনায় বেশি সহায়তা প্রদান করেছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসা ও বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, উচ্চ সুদের হার গ্রাহকদের আমানত আকর্ষণ করতে পারে, তবে সরকারী অনুদানের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপ বাড়াবে। ব্যাংকিং সেক্টরের লাভজনকতা হ্রাস পেলে, ঋণগ্রহণের শর্ত কঠিন হতে পারে এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা কমতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা হিসেবে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মডেলকে টেকসই করতে শারিয়াহ কাউন্সিলের সাথে সমন্বয়, ক্ষতির মূল কারণ বিশ্লেষণ এবং সরকারী সহায়তার কাঠামো পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। যদি অনুদানের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকে, তবে সরকারি বাজেটের উপর অতিরিক্ত চাপ এবং ব্যাংকিং সেক্টরের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।
সংক্ষেপে, গুজবের প্রভাব সাময়িক হলেও, উচ্চ সুদের হার, সরকারী অনুদান এবং ব্যাংকের ক্ষতির সমন্বয় আর্থিক বাজারে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মূল চাবিকাঠি হবে।



