১৪ বছর পর ঢাকা ও করাচির মধ্যে সরাসরি বিমান সংযোগ পুনরায় শুরু হয়েছে। নতুন রুটটি চালু করতে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং এটি বাণিজ্যিক ও পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়াকলাপ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ রুটে প্রথমে দু’টি বিমান সংস্থা সেবা প্রদান করবে, যার মধ্যে একটি জাতীয় ক্যারিয়ার এবং অন্যটি বেসরকারি এয়ারলাইন। উভয় সংস্থা প্রত্যাশা করছে যে, যাত্রী ও কার্গো ট্রাফিকের ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে, যা উভয় দেশের বাণিজ্যিক মুনাফা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
একই সময়ে দেশের বেসরকারি খাত গভীর আর্থিক সংকটে আটকে আছে। বহু শিল্পখাতের প্রতিষ্ঠান নগদ প্রবাহের ঘাটতি, ঋণ সঙ্কুচিত হওয়া এবং ক্রেডিটের কঠোর শর্তের মুখোমুখি। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলো ব্যাংকিং সিস্টেমের পুনর্গঠনের ফলে প্রাপ্ত ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেশের মোট উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি সক্ষমতাকে হ্রাস করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন যে, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে অতিরিক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং ১৫টির বেশি ব্যাংককে অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই নীতি পরিবর্তনগুলো বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ প্রাপ্তি সহজতর করতে পারে, তবে একই সঙ্গে ঋণদাতাদের জন্য কঠোর মানদণ্ডও আরোপ করবে।
বেসরকারি সংস্থাগুলোও নিজেদের অবস্থান উন্নত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। শিল্প সমিতিগুলো সরকারকে সরাসরি ক্রেডিট লাইন, সুদহ্রাসকৃত ঋণ এবং কর রেহাইয়ের দাবি জানাচ্ছে। পাশাপাশি, কিছু সংস্থা বিকল্প অর্থায়ন পদ্ধতি, যেমন বন্ড ইস্যু এবং ইকুইটি ফান্ডের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হল নগদ প্রবাহের ঘাটতি পূরণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইটের পুনরায় চালু হওয়া বাণিজ্যিক পরিবহন খরচ কমাবে এবং পণ্য রপ্তানি-আমদানি সময়সীমা হ্রাস করবে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, চামড়া এবং কৃষি পণ্যের রপ্তানিকারকদের জন্য এই রুটটি নতুন বাজারের দরজা খুলে দেবে। তবে, বেসরকারি খাতের আর্থিক সংকট সমাধান না হলে এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
সরকারের দৃষ্টিতে, বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবনের জন্য কয়েকটি মূল নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথমত, আর্থিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঋণ পুনর্গঠন এবং মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে। দ্বিতীয়ত, শিল্পখাতের জন্য বিশেষায়িত ফান্ড গঠন করে সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। তৃতীয়ত, রপ্তানি-নির্ভর শিল্পগুলোর জন্য এক্সপোর্ট ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের পরিসর বাড়ানো হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে।
বেসরকারি খাতের নেতারা এই নীতিগুলোকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন যে, দ্রুত বাস্তবায়ন হলে শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে তার বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং সময়মত সম্পাদনের ওপর। অতএব, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উচিত নীতিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনমতো সংশোধন করা।
সারসংক্ষেপে, ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইটের পুনরায় চালু হওয়া বাণিজ্যিক সংযোগের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে, তবে বেসরকারি খাতের আর্থিক অস্থিরতা সমাধান না হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সীমাবদ্ধ থাকবে। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং শিল্প সমিতির সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার, যাতে ক্রেডিট প্রবাহ পুনরুদ্ধার হয় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে। ভবিষ্যতে যদি এই উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবন দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে।
অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারক ও শিল্প নেতাদের জন্য এখনই সময় এসেছে, যাতে তারা সমন্বিত কৌশল গড়ে তোলেন এবং বেসরকারি খাতের সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এভাবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো আরও স্থিতিশীল এবং টেকসই হবে।



