ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস, প্রধান উপদেষ্টা, গতকাল ঢাকা শহরের স্টেট গেস্ট হাউস জামুনায় ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজ (UNHCR) এর নতুন দেশীয় প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইজেনের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনকে সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা নাগরিককে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে UNHCR-কে সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যেতে আহ্বান জানান।
বৈঠকের সময়, ইভো ফ্রেইজেন রোহিঙ্গা শিবিরে সহায়তা কমে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং শিবিরের বাসিন্দাদের স্বনির্ভরতা ও জীবিকা উন্নয়নের দিকে মনোযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি কক্সবাজারের শিবিরে মানবিক সহায়তার হ্রাসকে “নাটকীয় হ্রাস” বলে বর্ণনা করেন, যা শরণার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস উল্লেখ করেন, সাময়িক সরকারের গত এক বছরে রোহিঙ্গা সংকটের ওপর বেশ কিছু উচ্চপ্রোফাইল ইভেন্ট আয়োজনের পরেও আন্তর্জাতিক মনোযোগ যথেষ্ট নয়। রামজান মাসে জাতিসংঘের মহাসচিবের শিবির পরিদর্শনও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘমেয়াদী শিবিরে অবস্থান কোনো সমাধান নয়; এটি স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, “সমস্যা মিয়ানমারে শুরু হয়েছে, সমাধানও সেখান থেকেই আসা উচিত। শিবিরে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্রমশ হতাশ ও রাগান্বিত হচ্ছে, যা কোনো দেশের জন্যই ভাল নয়। আমাদের দায়িত্ব হল তাদের শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করা।” এই বক্তব্যে তিনি শিবিরে তরুণদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করেন।
বৈঠকে বশান চর শরণার্থী প্রকল্প, আসন্ন সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট, এবং দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পর্কেও আলোচনা হয়। ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস উল্লেখ করেন, বশান চর দ্বীপে গৃহস্থালির বেশিরভাগ শরণার্থী ইতিমধ্যে মূল ভূখণ্ডে মিশে গেছেন, যা বাংলাদেশে নতুন সামাজিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য সমন্বিত নীতি ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
UNHCR প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা শিবিরে সহায়তার হ্রাসের ফলে শরণার্থীদের স্বনির্ভরতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ এবং কাজের সুযোগের মতো উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস এই উদ্যোগগুলোকে রোহিঙ্গা জনগণের স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন এবং আন্তর্জাতিক দাতাদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সমন্বিত কৌশল গড়ে তোলার জন্য সময়সীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়। তিনি শেষ করেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী শিবিরে অবস্থান না করে, তাদের নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করা দেশের মানবিক দায়িত্ব এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি।



