ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত এ-র মধ্যে বহু বছরব্যাপী আলোচনার পর শেষমেশ একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে শুল্কের বাধা অধিকাংশ পণ্যের জন্য দূর করে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। বিশেষত ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি করে এমন দেশগুলোর জন্য এর প্রভাব গভীর।
চুক্তির মূল বিষয় হল টেক্সটাইল, পোশাক, চামড়া ও জুতা ইত্যাদি সেক্টরে শুল্কের সম্পূর্ণ হ্রাস। উদাহরণস্বরূপ, জুতার ওপর প্রযোজ্য ১৭ শতাংশ শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনা হবে, আর পোশাক ও টেক্সটাইলের ৯‑১২ শতাংশ শুল্কও সম্পূর্ণ বাদ পড়বে। ফলে ভারত এ এই পণ্যগুলোকে ইউরোপীয় গ্রাহকদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে পারবে।
এই সেক্টরগুলোই দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইউরোপীয় রপ্তানির মূল ভিত্তি। টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্ববাজারে উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে এবং শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা এ পর্যন্ত এর প্রতিযোগিতামূলক প্রান্ত বজায় রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নভেম্বর ২০২৬-এ কম উন্নত দেশ (LDC) মর্যাদা থেকে মুক্তি পাবে। এ সময়ের পর তিন বছরের ট্রানজিশন পিরিয়ডের শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি বিশেষ পছন্দের শুল্কমুক্ত সুবিধা ধীরে ধীরে শেষ হবে। তাই এই সময়ে ভারত এ-র শুল্কমুক্ত প্রবেশের ফলে বাজারের প্রতিযোগিতা তীব্র হবে।
বছরের পর বছর ধরে ভারত এ-র ইউরোপীয় রপ্তানি শুল্কের ভারে ছিল। এখন চুক্তির মাধ্যমে প্রায় সব পণ্যের শুল্ক সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ভারত এ-কে মূল্য দিক থেকে ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
শুল্কের পার্থক্য দূর হওয়ার ফলে ভারত এ-র পণ্যগুলো ইউরোপীয় বাজারে দ্রুত প্রবেশের সুবিধা পাবে, আর বাংলাদেশ ব্যাংক পূর্বে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতো, তা এখন সমান শর্তে থাকবে না। ফলে দুই দেশের মধ্যে মূল্য ও গুণগত দিক থেকে নতুন প্রতিযোগিতা দেখা দেবে।
পূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংক শুল্কমুক্ত LDC সুবিধা ব্যবহার করে ভারত এ ও ভিয়েতনাম মতো দেশের তুলনায় দ্রুত বাজার শেয়ার বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। ২০১০ সালে ইউরোপীয় পোশাক আমদানি বাজারে চীনের অংশ ৪৫ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে, আর একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অংশ প্রায় ৭ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০০৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ভারত এ ইউরোপীয় বাজারে প্রায় সমান শেয়ার রাখত। তবে পরবর্তী দুই দশকে বাংলাদেশ ব্যাংকের শেয়ার তিনগুণ বাড়তে থাকে, যেখানে ভারত এ-র শেয়ার প্রায় ৫ শতাংশে নেমে আসে। এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে রপ্তানি কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য এখন শুল্কমুক্ত সুবিধার ওপর নির্ভর না করে উৎপাদন দক্ষতা, পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। নীতি নির্ধারকদের উচিত গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো, সরবরাহ শৃঙ্খলে আধুনিকীকরণ আনা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান করা। এভাবেই দেশটি EU-ভারত এ চুক্তির ফলে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে রপ্তানি মডেলকে টেকসই করতে পারবে।



