শিশুদের স্কুল ব্যাগের অতিরিক্ত ওজনের ফলে দীর্ঘমেয়াদী পিঠের ব্যথা ও ভঙ্গি সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে, যা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে শিশুর শারীরিক বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতিতে বাবা-মা সাধারণত এক বছরব্যাপী স্কুল সামগ্রী কিনে থাকেন; নতুন ইউনিফর্ম, টিফিন বক্স, জুতো এবং প্রয়োজনে নতুন ব্যাগ। এই সামগ্রীগুলো একত্রে ব্যাগের ভর বাড়িয়ে দেয়, যা শিশুর শারীরিক সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত হয়ে ওঠে।
একজন শিশুর ক্ষেত্রে, ক্লাসের কাজ ও হোমওয়ার্কের জন্য আলাদা কপি, চার-পাঁচটি বই, পানির বোতল এবং টিফিন বক্স একসাথে ব্যাগে রাখা হয়। এই সব জিনিসের সমন্বয়ে ব্যাগের ওজন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শিশুটি তা নিয়ে পাঁচতলা ক্লাসরুমে ওঠা-নামা করতে কষ্ট পায়।
এক বছর, অভিভাবকরা শিশুর জন্য টrolley‑ধরনের ব্যাগ কিনে দেন, যা চাকার মাধ্যমে টানা যায়। সহপাঠীদের মধ্যে এই ব্যাগের ব্যবহার নিয়ে প্রশংসা ও কৌতুকের সৃষ্টি হয়; ছোট শিশুরা চাকার হ্যান্ডেলকে দেখে বিস্মিত হয়। তবে এই সুবিধা পুরোপুরি সমস্যার সমাধান করে না, কারণ ব্যাগটি এখনও পাঁচতলা সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে যেতে হয়।
কয়েক দিন পর, শিক্ষকবৃন্দ ব্যাগের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং অভিভাবকদের জানিয়ে দেয় যে, শিক্ষার্থীদের চাকার ব্যাগ ব্যবহার করা অনুমোদিত নয়, কারণ তা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। ফলে শিশুকে আবার সাধারণ ব্যাকপ্যাক ব্যবহার করে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা-নামা করতে হয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, সেই শিশুটি এখন পিঠের ব্যথা ও ভঙ্গি সমস্যায় ভুগছে, যা প্রায়শই তার শৈশবের অতিরিক্ত ব্যাগ বহনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই অভিজ্ঞতা বহু অভিভাবকের জন্য প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর অতিরিক্ত ব্যাগের প্রভাব কতটা গভীর।
চিকিৎসা সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী, শিশুর ব্যাগের ওজন তার দেহের ওজনের ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। এই সীমা অতিক্রম করলে পেশী ও হাড়ের বিকাশে ব্যাঘাত ঘটতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে মেরুদণ্ডের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভারী ব্যাগ ধারাবাহিকভাবে বহন করলে কাঁধ, ঘাড় ও পিঠে ব্যথা, স্কোলিওসিস এবং অন্যান্য মস্কুলোস্কেলেটাল রোগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এসব রোগের প্রভাব প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও অব্যাহত থাকতে পারে, যা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতায় বাধা সৃষ্টি করে।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, কেন এতগুলো বই, নোটবুক এবং অন্যান্য সামগ্রী একসাথে ব্যাগে রাখা হয়? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই একাধিক পাঠ্যপুস্তক ও অতিরিক্ত উপকরণ দাবি করে, যা ব্যাগের ওজন বাড়িয়ে দেয়। এই প্রয়োজনীয়তা ও শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যের মধ্যে সমতা রক্ষা করা এখনো একটি চ্যালেঞ্জ।
২০১৬ সালে, উচ্চ আদালত একটি রিট পিটিশনের জবাবে শিশুদের ভারী ব্যাগ বহনের মানবিক দিক নিয়ে মতামত প্রকাশ করে। আদালত এই বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাগের ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানায়।
সেই সময়ের পর থেকে, কিছু বিদ্যালয়ে ব্যাগের ওজন সীমা নির্ধারণের জন্য নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, তবে বাস্তবায়ন এখনও অসমান। অনেক স্কুলে এখনও প্রচলিত পদ্ধতি বজায় রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের একাধিক বই ও নোটবুক একসাথে বহন করতে হয়।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ প্রয়োজন: প্রথমে, পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা কমিয়ে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় বইই ব্যাগে রাখুন; দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল লার্নিং মডিউল ব্যবহার করে শারীরিক বইয়ের পরিমাণ হ্রাস করুন; তৃতীয়ত, ব্যাগের পিঠের অংশে প্যাডিং ও সমর্থন ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন এবং নিয়মিত ব্যাগের ওজন মাপুন।
শিশুর স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় ব্যাগের ওজন নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব অবহেলা করা যায় না। আপনি কি আপনার শিশুর ব্যাগের ওজন নিয়মিত চেক করে দেখছেন? কীভাবে আপনার বিদ্যালয় এই সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নিচ্ছে?



