ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত এ গত মঙ্গলবার একটি বিস্তৃত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে ভারত এ পোশাক প্রস্তুতকারকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। চুক্তিটি ইউরোপীয় কাউন্সিল, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ভারত এ পার্লামেন্টের অনুমোদনের পর ২০২৭ সালে কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই নতুন ব্যবস্থা সরাসরি বাংলাদেশী গার্মেন্টস রপ্তানির প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে পরিবর্তন আনবে।
চুক্তির মূল শর্তের মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভারত এ পোশাক পণ্যের উপর বর্তমান ১২ শতাংশ শুল্ককে শূন্যে নামিয়ে আনা, যা পূর্বে ঢাকা শহরের রপ্তানিকৃত পণ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে কাজ করছিল। শুল্কহ্রাসের ফলে ভারত এ উৎপাদিত পোশাকের দাম ইউরোপীয় বাজারে কমে যাবে, ফলে বাংলাদেশী রপ্তানিকারকদের মূল্য ও বাজার শেয়ার বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
বর্তমানে বাংলাদেশি গার্মেন্টস ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে, তবে এই সুবিধা শুধুমাত্র তিন বছর পর্যন্ত সীমিত থাকবে, কারণ দেশটি এই বছর নভেম্বরের মধ্যে সর্বনিম্ন উন্নত দেশ (LDC) তালিকা থেকে বাদ পড়বে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক হিসেবে চিহ্নিত, চীনকে ছাড়িয়ে ডেনিম, ট্রাউজার এবং টি-শার্টের মতো কিছু ক্যাটেগরিতে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। ইউরোপীয় বাজারে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনের পোশাক বাংলাদেশি ডেনিম দিয়ে তৈরি, এ ধরনের পরিসংখ্যান দেশের রপ্তানি ভিত্তি শক্তিশালী করে তুলেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, ভারত এ শুল্কমুক্ত প্রবেশের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশি গার্মেন্টসের প্রতিযোগিতা তীব্র হবে এবং মূল্যচাপ বাড়বে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই পরিবর্তন বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের লাভজনকতা ও বাজার শেয়ারকে হ্রাস করতে পারে, যদি না নতুন কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের লক্ষ্য ২০৩২ সালের মধ্যে ভারত এ রপ্তানি দ্বিগুণ করা, যার জন্য ৯৬.৬ শতাংশ মূল্যের পণ্য থেকে শুল্ক বাদ বা কমানো হবে এবং ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য আনুমানিক €৪ বিলিয়ন শুল্ক সাশ্রয় হবে। একই সময়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারত এ থেকে আমদানি করা পণ্যের ৯৯.৫ শতাংশের শুল্ক সাত বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে হ্রাস করার পরিকল্পনা করেছে, যা ভারত এ উৎপাদনকারী শিল্পের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে।
বছর ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশি গার্মেন্টসের মোট রপ্তানির অর্ধেকের বেশি অংশীদারিত্ব রাখে, যার মূল্য প্রায় $১৯.৭১ বিলিয়ন। যদি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা কোনো বিকল্প বাণিজ্য চুক্তি না পায়, তবে ইউরোপীয় বাজারে তাদের শেয়ার হ্রাস পেতে পারে এবং মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, বাংলাদেশকে এখনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে নতুন বাজার অনুসন্ধান, পণ্যের মানোন্নয়ন এবং খরচ কাঠামো শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। অন্যদিকে, ভারত এ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা মোকাবিলার জন্য সরকারকে নীতি সমর্থন ও রপ্তানি সহায়তা বাড়াতে হবে। ভবিষ্যতে শুল্কমুক্ত প্রবেশের ফলে গঠিত বাজার গতিশীলতা বাংলাদেশি গার্মেন্টস শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা নির্ধারণ করবে।



