গত বুধবার ঢাকার আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতাল (এডব্লিউসিএইচ) এ ‘রিডিউসিং আননেসেসারি সিজারিয়ান সেকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা ফলাফল প্রকাশের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। গবেষণার ভিত্তিতে জানানো হয়েছে যে, গত বছর দেশে মোট প্রায় ৩৫ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৬.৮ লাখ শিশুর জন্ম অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গ্লোবাল স্তরে প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে একটির জন্ম সিজারিয়ান মাধ্যমে হয়, যা প্রায় ২১ শতাংশের সমান। তবে বাংলাদেশে এই হার দ্বিগুণের কাছাকাছি, যেখানে মোট শিশুর জন্মের প্রায় ৪৫ থেকে ৫২ শতাংশই সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই প্রবণতা আরও তীব্র। গবেষণায় দেখা যায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতি দশটি শিশুর মধ্যে আট থেকে নয়টি শিশুর জন্ম সিজারিয়ান মাধ্যমে হয়, যা ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের সমান। এই উচ্চ হারকে উদ্বেগজনক বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।
অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশনের ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বিশাল। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশনের কারণে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি মূলত অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন খরচ এবং মাতৃস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাবের মাধ্যমে সঞ্চিত হয়।
বেসরকারি মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি ঘাটতি সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে যে, দেশের বেসরকারি মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশের বেশি পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে। তদারকি না থাকায় মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা এবং মানসম্মত লেবার রুমের অভাব রয়েছে। ফলে সিজারিয়ান সেকশনকে সহজ সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যদিও তা মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই অবস্থা মাতৃ ও শিশুর নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাঈদুর রহমান অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গাফিলতি বাড়ছে এবং স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগ কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মায়েরা অপ্রয়োজনীয় শল্যচিকিৎসার ঝুঁকিতে আটকে আছে।
গবেষণার প্রধান উপস্থাপক অধ্যাপক আনজুমান আরা জানান, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশন কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং মাতৃ মৃত্যুহার এবং নবজাতকের স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগ পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা একমত যে, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশন কমাতে কঠোর তদারকি, মানসম্মত লেবার রুমের নির্মাণ এবং প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া, গর্ভবতী নারীদের সঠিক তথ্য প্রদান এবং স্বাভাবিক প্রসবের সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
এই গবেষণা থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে স্বাভাবিক প্রসবের বিকল্প হিসেবে সিজারিয়ান সেকশন অতিরিক্তভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান করা হচ্ছে।
আপনার মতামত কী? অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশন কমাতে কী ধরনের নীতি ও তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে?



