জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) ব্যবহারকারী গবেষক দল সম্প্রতি একটি উজ্জ্বল গ্যালাক্সি শনাক্ত করেছে, যার নাম MoM‑z14। এই গ্যালাক্সি বিগ ব্যাং ঘটনার পর প্রায় ২৮০ মিলিয়ন বছরেই গঠিত হয়েছিল, যা বর্তমানের ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের মহাবিশ্বের তুলনায় অত্যন্ত প্রাচীন। গ্যালাক্সিটির এই বয়সের তথ্য জ্যোতির্বিদদের জন্য মহাবিশ্বের শুরুর অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি প্রমাণ সরবরাহ করে।
MoM‑z14 গ্যালাক্সি তার উজ্জ্বলতা এবং দূরত্বের কারণে গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জ্যোতির্বিদরা উল্লেখ করেন যে, এই গ্যালাক্সি বিগ ব্যাংয়ের পর প্রথম কয়েকশো মিলিয়ন বছরে গঠিত সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণগুলোর একটি। এর ফলে, গ্যালাক্সিটি প্রারম্ভিক মহাবিশ্বের গঠন প্রক্রিয়া এবং তার পরিবেশের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচনা বিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।
গ্যালাক্সিটির বয়স নির্ধারণের জন্য JWST-এর নিকট-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফ (NIRSpec) ব্যবহার করা হয়েছে। এই যন্ত্রটি গ্যালাক্সি থেকে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে, যা মহাকাশে ভ্রমণের সময় বিকৃত হয়। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা গ্যালাক্সির রেডশিফট নির্ণয় করে, ফলে তার বয়স ও দূরত্ব সুনির্দিষ্টভাবে অনুমান করতে পেরেছেন।
প্রাথমিক পর্যায়ের গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে MoM‑z14 বিশেষভাবে নজরকাড়া কারণ এতে নাইট্রোজেনের ঘনত্ব প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। পূর্বে অনুমান করা হয়েছিল যে এত প্রাচীন গ্যালাক্সিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ সীমিত থাকবে, তবে এই পর্যবেক্ষণ তা বিপরীত প্রমাণ করে। উচ্চ মাত্রার নাইট্রোজেনের উপস্থিতি গ্যালাক্সির রসায়নীয় বিবর্তন এবং তার নক্ষত্র গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে।
অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল গ্যালাক্সিটি যে রিইয়নাইজেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। রিইয়নাইজেশন বলতে বোঝায়, প্রাথমিক হাইড্রোজেনের ঘন কুয়াশা যখন তীব্র আলোর মাধ্যমে আয়নিত হয়, ফলে মহাবিশ্বের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। MoM‑z14 এর আলো ও স্পেকট্রাল বৈশিষ্ট্য থেকে দেখা যায়, এই গ্যালাক্সি তার নক্ষত্রগুলির মাধ্যমে পর্যাপ্ত শক্তি উৎপন্ন করে, যা সেই সময়ের হাইড্রোজেন কুয়াশা ভেঙে দিতে সহায়তা করেছে।
গবেষক দল জোর দিয়ে বলেন যে, JWST-এর ক্ষমতা পূর্বের যেকোনো টেলিস্কোপের তুলনায় অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে সক্ষম, এবং এই নতুন গ্যালাক্সি তাদের প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেছে। এই অপ্রত্যাশিত ফলাফল বিজ্ঞানীদের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে উত্তেজনা উভয়ই নিয়ে এসেছে।
একজন দল সদস্য উল্লেখ করেছেন, বর্তমান পর্যবেক্ষণগুলো মহাবিশ্বের প্রারম্ভিক সময়ের চিত্রকে আগে কখনো না দেখা রূপে উপস্থাপন করছে, এবং এখনও অনেক অজানা দিক বাকি রয়েছে। তিনি আরও জানান, MoM‑z14 এর মতো গ্যালাক্সি ভবিষ্যতে আরও গভীর গবেষণার মাধ্যমে মহাবিশ্বের গঠন ও বিকাশের ধাপগুলো স্পষ্ট করতে সাহায্য করবে।
এই গবেষণার ফলাফল Open Journal of Astrophysics-এ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বিশদ ডেটা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে। প্রকাশনায় গ্যালাক্সির স্পেকট্রাল ডেটা, রেডশিফট মান এবং নাইট্রোজেনের ঘনত্বের পরিমাপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যগুলো জ্যোতির্বিদদেরকে প্রারম্ভিক গ্যালাক্সির রসায়ন, নক্ষত্র গঠন এবং মহাবিশ্বের স্বচ্ছতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করছে। বিশেষ করে, উচ্চ নাইট্রোজেনের উপস্থিতি গ্যালাক্সি গঠনের তাত্ত্বিক মডেলগুলোতে নতুন সমন্বয় প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
JWST-এর ভবিষ্যৎ মিশনগুলোতে আরও দূরবর্তী ও প্রাচীন গ্যালাক্সি অনুসন্ধানের পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষকরা আশা করছেন, অতিরিক্ত উদাহরণ সংগ্রহের মাধ্যমে প্রারম্ভিক মহাবিশ্বের বৈশিষ্ট্যগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে মানচিত্রায়িত করা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, MoM‑z14 গ্যালাক্সি জ্যোতির্বিদদেরকে মহাবিশ্বের শুরুর মুহূর্তে কী ঘটছিল তা পুনরায় ভাবতে বাধ্য করেছে। এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানকে নতুন দিকনির্দেশনা দেয় এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। আপনি কি ভাবছেন, আর কোন গ্যালাক্সি আমাদেরকে মহাবিশ্বের অতীতের গোপনীয়তা উন্মোচন করবে?



