সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ঢাকার কারওয়ানবাজারে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ বক্তব্য রাখেন। তিনি উল্লেখ করেন, মন্ত্রণালয়ে প্রতিদিন শত শত তদবিরের আবেদন আসে এবং পূর্বে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা প্রদান করলেই কাজ সম্পন্ন হতো, ফলে সরাসরি মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার প্রয়োজন কম ছিল। বর্তমান সময়ে সুযোগের আশায় বহু ব্যক্তি সরাসরি মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত হচ্ছেন, যা পূর্বের তুলনায় প্রক্রিয়াকে জটিল করেছে।
বক্তা জানান, পূর্বের সরকারের সময়ে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল অবস্থায় ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। তবু তিনি সতর্ক করেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনও বিদ্যমান এবং এই বছরের জিডিপি বৃদ্ধির হার পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি প্রত্যাশিত হারে কমেনি, যদিও সামগ্রিক প্রবণতা ধীরে ধীরে নিম্নমুখী।
মাহমুদ অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের আর্থিক নীতিগুলোর সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারী সময়ে অর্থনীতি উন্নত দেখালেও ব্যাংকিং খাতের ভিত্তি ক্ষয়প্রাপ্ত ছিল এবং বিশাল পরিমাণ মূলধন বিদেশে সরে গিয়েছিল। আর্থিক শৃঙ্খলার ভাঙ্গন বাজেটের সামঞ্জস্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে তিনি তর্ক করেন। এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালে কোনো অভ্যুত্থান না ঘটলেও ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে, কারণ দুর্নীতি ও অন্যায়ের ফলে অর্থনীতি আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের হ্রাস এবং উচ্চ সুদের হার নতুন বিনিয়োগে অনীহা বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা তীব্র সংকটে আছেন; তারা নতুন প্রকল্পে অর্থায়ন পেতে পারছেন না এবং বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণে দ্বিধা করছেন। দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ সুদের হার বজায় থাকলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে, এ বিষয়টি তিনি জোর দিয়ে বলেন।
মহামুদের মতে, সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত কমানোর ধারণা এখন বাস্তবিকভাবে কার্যকর নয়। যদিও মুদ্রাস্ফীতি ১১ শতাংশ থেকে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে আট শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, তবু প্রত্যাশিত হারে কমেনি। তিনি উল্লেখ করেন, মূল্যস্ফীতির নিম্নগামী প্রবণতা সত্ত্বেও তা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা এখনো কঠিন।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, বর্তমান সরকার দাবি করে যে অর্থনৈতিক নীতি ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নমুখী এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারী সূত্রে বলা হয়, উচ্চ সুদের হার সাময়িক এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি কার্যকর। এছাড়া, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদবিরের সংখ্যা বাড়ার কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করে যে জনসাধারণের চাহিদা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রক্রিয়াগুলোকে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
ড. ওয়াহিদউদ্দিনের মন্তব্যগুলো রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো সরকারী নীতি ও প্রশাসনিক পদ্ধতির ওপর জনমত গঠন করতে পারে। তিনি যে তদবিরের অতিরিক্ততা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা নির্বাচনী সময়ে বিরোধী দলগুলোর জন্য সমালোচনার ভিত্তি হতে পারে। একই সঙ্গে, সরকার যদি এই উদ্বেগগুলোকে স্বীকার করে সংশোধনী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে তা জনসাধারণের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বক্তব্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার জটিলতা ও দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ উভয়ই তুলে ধরেছে। তিনি তদবিরের অতিরিক্ততা, ঋণপ্রবাহের হ্রাস, উচ্চ সুদের হার এবং মুদ্রাস্ফীতির ধীরগতি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন, পাশাপাশি পূর্বের সরকারের আর্থিক নীতির দুর্বলতা উল্লেখ করেছেন। ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলো রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে এবং নীতি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা বাড়াতে পারে।



