ইসরায়েল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায় বসবাসরত ৩২টি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ি ত্যাগের শেষ তারিখ রমজান মাসের শেষের দিকে নির্ধারিত হয়েছে। আদালতের আদেশের ভিত্তিতে উচ্ছেদের নোটিশ স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যা ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের নতুন ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিলওয়ানের এক বাসিন্দা কায়েদ রাজাবি রায়ের পর নোটিশ পেয়েছেন এবং একই সঙ্গে তার প্রতিবেশী পরিবারগুলোকে একই সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন যে নোটিশটি রয়টার্সকে দেখিয়ে আদালতের নির্দেশের কপি প্রকাশ করা হয়েছে। উচ্ছেদের নথি আতেরেত কোহানিম নামে ইহুদি বসতি সংস্থার হাতে হস্তান্তর করা হবে, যা ইতিমধ্যে এলাকায় বেশ কয়েকটি বাড়ি দখল করে ফ্ল্যাগ উড়িয়ে দিয়েছে।
আতেরেত কোহানিমের কার্যক্রমের ফলে প্রায় চল্লিশটি ভবন ইতিমধ্যে ইহুদি পতাকা দিয়ে সজ্জিত হয়েছে, যা নতুন বসতি স্থাপনের দৃশ্যমান চিহ্ন হিসেবে কাজ করছে। এই পতাকাগুলোকে সংস্থা দখলকৃত সম্পত্তির স্বীকৃতি হিসেবে উপস্থাপন করে, যদিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করছেন।
কায়েদ রাজাবি ও তার পরিবার ১৯৬৭ সাল থেকে সিলওয়ানের এই বাড়িতে বসবাস করে আসছেন; তিনি জর্ডানি কর্মকর্তার কাছ থেকে জমি ক্রয় করে এখানে স্থায়ী হয়েছেন। তিনি জানান, তার পরিবার বহু প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী বাসস্থানকে ছেড়ে যাওয়া মানে আত্মীয়তার মূল ভিত্তি হারিয়ে ফেলতে হবে।
রাজাবি আবেগপূর্ণভাবে প্রকাশ করেছেন, “যে ঘরে আমি জন্মেছি, প্রথমবার চোখ মেলেছি, এখন আমাকে জোর করে ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে।” তার এই মন্তব্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে, যা উচ্ছেদের মানবিক দিককে তুলে ধরেছে।
আতেরেত কোহানিমের নির্বাহী পরিচালক ড্যানিয়েল লুরিয়া উচ্ছেদের বৈধতা রক্ষা করে বলেন, সিলওয়ানের জমি ১৯২৯ সালের আগে ইয়েমেনি ইহুদি সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন ছিল এবং বর্তমান দখল ঐতিহাসিক অন্যায় সংশোধনের অংশ। তিনি এই দৃষ্টিকোণ থেকে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের “অবৈধ দখলদার” বলে উল্লেখ করেন।
ড্যানিয়েল লুরিয়ার দাবির বিরুদ্ধে রাজাবি ও অন্যান্য বাসিন্দা এটিকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেন, এবং যুক্তি দেন যে বর্তমান দখল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং মানবিক অধিকার লঙ্ঘন। উভয় পক্ষের মধ্যে মতবিরোধের ফলে এলাকায় উত্তেজনা বাড়ছে।
ইসরায়েলের ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের সাম্প্রতিক মন্তব্যে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা “কবর রচনা” করার লক্ষ্যই ইসরায়েলের নীতি। এই বক্তব্য ইসরায়েলের পুরো জেরুজালেমকে অবিভাজ্য রাজধানী হিসেবে গণ্য করার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানকে পুনর্ব্যক্ত করে, যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশ দেশ এই দাবি স্বীকার করে না।
ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছে, এবং সিলওয়ানকে এই দাবির কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে দেখছে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের এই নতুন পর্যায়ে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনার জটিলতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইউনাইটেড নেশনসের নিরাপত্তা পরিষদ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা উচ্ছেদ আদেশকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করেছেন এবং ইসরায়েলকে আইনি প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী যদিও ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগকে স্বীকার করে, তবু তারা উচ্ছেদের মানবিক প্রভাবের প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অক্টোবর ২০২৩-এ গাজা যুদ্ধের সূচনা থেকে সিলওয়ানসহ পূর্ব জেরুজালেমের বেশ কয়েকটি এলাকায় ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের গতি তীব্রতর হয়েছে; এই সময়ে উচ্ছেদ, বাড়ি ধ্বংস এবং সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সিলওয়ানের মতো ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন এলাকায় এই ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলবে।
উল্লেখযোগ্য যে, রমজান শেষের মধ্যে উচ্ছেদ সম্পন্ন না হলে ইসরায়েলি আদালত অতিরিক্ত আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে, যা স্থানীয় জনসংখ্যার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে তীব্র নজরদারি ও নীতি সমন্বয়ের দাবি বাড়িয়ে তুলছে, এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।



