বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সরকারী ভর্তুকি ও বিদেশি ঋণ পরিশোধের সময় পর্যন্ত রাষ্ট্র মালিকানাধীন ও যৌথ অংশীদারিত্বে পরিচালিত বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর লভ্যাংশ বণ্টন বন্ধের নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। নির্দেশনাটি ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট ২০টি বিদ্যুৎ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পিডিবি, আরইবি চেয়ারম্যানকে চিঠি মারফত পাঠানো হয়। পরবর্তী কোনো নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সরকারি ভর্তুকি সহায়তা চলাকালীন এবং বিদেশি ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো শেয়ারহোল্ডারকে লভ্যাংশ প্রদান করা যাবে না। এছাড়া, সরকারী মালিকানাধীন ও যৌথ অংশীদারিত্বে গঠিত বিদ্যুৎ সংস্থার কর্মচারী-অধিকর্তাদের মধ্যে মুনাফা ভাগাভাগি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হল, সরকারী তহবিলের ব্যবহারকে সম্পূর্ণভাবে সেক্টরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেবা সম্প্রসারণে কেন্দ্রীভূত করা।
প্রেরিত চিঠিতে উল্লেখিত একমাত্র ট্রান্সমিশন সংস্থা হল Power Grid PLC Bangladesh (PGCB)। ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণের দায়িত্বে থাকা এই সংস্থার মুনাফা ভাগাভাগি বন্ধের নির্দেশনা সরাসরি মন্ত্রণালয়ের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিতরণ সেক্টরে চারটি কোম্পানিকে এই নির্দেশনা প্রযোজ্য হয়েছে: ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন PLC (DPDC), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই PLC (DESCO), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন PLC (WZPDCL) এবং নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই PLC (NESCO)। এই সংস্থাগুলো শহর ও গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল দায়িত্বে রয়েছে এবং সরকারী ভর্তুকি গ্রহণের ফলে তাদের আর্থিক নীতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে পরিবর্তিত হবে।
উৎপাদন সংস্থার তালিকায় রয়েছে আশুগঞ্জ পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি PLC (APSC), কোল পাওয়ার জেনারেশন PLC (CPG), নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন PLC (NWPGC), BR পাওয়ারজেন লিমিটেড (BRPL), ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন PLC বাংলাদেশ (EGCB) এবং বাংলাদেশ রুরাল পাওয়ার লিমিটেড (RPC)। এসব জেনারেশন ইউনিট সরকারী ভর্তুকি গ্রহণের শর্তে মুনাফা ভাগাভাগি বন্ধের আওতায় পড়বে, ফলে উৎপাদন খাতে আর্থিক রিজার্ভ বৃদ্ধি পাবে।
যৌথ অংশীদারিত্বে গঠিত সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে RPC Norinco International Power Ltd (RNPL), বাংলাদেশ–ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি, বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (BCPCL), বাংলাদেশ চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি (BCREC), বে অব বেঙ্গল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, ইউনাইটেড আশুগঞ্জ এনার্জি লিমিটেড, বাংলাদেশ পাওয়ার ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (BPEMC), বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (BESCO) এবং সেম্বকর্প নর্থওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (SNWPC)। এই যৌথ সংস্থাগুলো বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সমন্বয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে অংশগ্রহণ করে, তাই মুনাফা ভাগাভাগি বন্ধের ফলে তাদের নগদ প্রবাহে প্রভাব পড়বে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, লভ্যাংশ বন্ধের ফলে শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশিত নগদ রিটার্নে সাময়িক হ্রাস দেখা দিতে পারে। তবে, সরকারী তহবিলের ব্যবহারকে মূলধনী প্রকল্পে কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সেক্টরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নীতি বিশেষ করে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও গ্রিড আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে গৃহীত হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংস্থাগুলো এখন থেকে মুনাফা সংরক্ষণ করে ঋণ পরিশোধ ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করতে বাধ্য। ফলে, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, গ্রিড সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ বিদ্যুৎসেবার বিস্তারে অতিরিক্ত তহবিল উপলব্ধ হবে। একই সঙ্গে, সরকারী ভর্তুকি শেষ হওয়ার পর বা বিদেশি ঋণ পরিশোধ সম্পন্ন হওয়ার পর পুনরায় লভ্যাংশ বিতরণে অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
এই নির্দেশনা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পরবর্তী কোনো নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বর্তমান নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে। তাই, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে তাদের আর্থিক পরিকল্পনা ও শেয়ারহোল্ডার নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, সরকারী ভর্তুকি ও ঋণ পরিশোধের সময় পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংস্থার মুনাফা ভাগাভাগি বন্ধের সিদ্ধান্ত সেক্টরের আর্থিক স্বচ্ছতা ও সম্পদ ব্যবহারকে কেন্দ্রিক করে। এই নীতি শেয়ারহোল্ডারদের স্বল্পমেয়াদী রিটার্নে প্রভাব ফেললেও, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর উন্নয়ন ও সেবা গুণগত মান বাড়াতে সহায়তা করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



