ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানিয়েছে যে, ১ কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখ কার্ড গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে গেছে। এই কার্ডগুলো সরকারী ভর্তুকি ভিত্তিক পণ্য ক্রয়ের সুবিধা দেয়, যা নিম্ন আয়ের পরিবারকে মূল্যের তুলনায় কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করে।
টিসিবির মুখপাত্রের মতে, ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৭০ লাখের কাছাকাছি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। এক কোটি কার্ডের মধ্যে ২৩ লাখের তথ্য এখনো সংগ্রহ করা হয়নি, আর বাকি ৭৭ লাখের মধ্যে প্রায় ৭০ লাখ ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৭ লাখের বেশি কার্ডের ডেটা টিসিবির নিকটেই রয়েছে এবং সেগুলো বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকরা সয়াবিন তেল, মশুর ডাল, চিনি, ছোলা, আলু, পেঁয়াজ, খেজুর, রাইস ব্রান তেল, পাম তেল, সূর্যমুখী তেল, ক্যানোলা তেল, ডিটারজেন্টসহ বিভিন্ন পণ্য ভর্তুকি মূল্যে কিনতে পারেন। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি অনুসারে এই পণ্যের তালিকা ও মূল্য নির্ধারিত হয়, যাতে দরিদ্র পরিবারগুলোকে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী সুবিধা প্রদান করা যায়।
মিরপুরের একজন রিকশা চালক সম্প্রতি তার স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করে ৩০ টাকায় কেজি দরে ৫ কেজি চাল, ৬০ টাকায় কেজি দরে ২ কেজি মশুর ডাল, ১০০ টাকায় লিটার দরে ২ লিটার সয়াবিন তেল এবং ৭০ টাকায় কেজি দরে চিনি কিনেছেন। তিনি অতিরিক্তভাবে ভর্তুকি মূল্যে সাবানও ক্রয় করেছেন। এই উদাহরণটি দেখায় যে, কার্ডধারীরা দৈনন্দিন খাবার ও গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী কম দামে পেতে সক্ষম।
গ্রাহকের মতামত অনুসারে, বর্তমান পণ্যের গুণমান সন্তোষজনক হলেও, আইটেমের পরিধি ও পরিমাণ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, এক পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে বর্তমান সীমিত পরিমাণ যথেষ্ট নয়, তাই ভবিষ্যতে আরও বেশি পণ্য ও বড় পরিমাণে সরবরাহ করা হলে সুবিধা বৃদ্ধি পাবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, টিসিবির এই উদ্যোগ সরাসরি ভোক্তা মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করে। যখন দরিদ্র পরিবারগুলো ভর্তুকি মূল্যে পণ্য পায়, তখন সাধারণ বাজারে চাহিদা হ্রাস পায়, যা মূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। তবে একই সঙ্গে, বৃহৎ পরিমাণে সরকারী ভর্তুকি পণ্য বাজারে প্রবেশ করলে বেসরকারি বিক্রেতাদের লাভের মার্জিন সংকুচিত হতে পারে, যা শিল্পের সামগ্রিক লাভজনকতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ডেটা ব্যবস্থাপনা দিক থেকে, ২৩ লাখ কার্ডের তথ্য এখনও সংগ্রহ না হওয়া একটি চ্যালেঞ্জ। সঠিক তথ্য ছাড়া লক্ষ্যভিত্তিক বিতরণ ও পর্যবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ে। টিসিবি যদি এই ডেটা দ্রুত সংগ্রহ করে, তবে ভবিষ্যতে বিতরণ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে, এবং ভর্তুকি সিস্টেমের অপব্যবহার কমে যাবে।
স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের বিস্তৃত ব্যবহার সরকারী সামাজিক সুরক্ষা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি দরিদ্র পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, ফলে তাদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার উন্নতি সম্ভব হয়। একই সঙ্গে, ভর্তুকি ভিত্তিক পণ্যের চাহিদা বাড়ার ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে, যা সময়মতো স্টক নিশ্চিত করা এবং মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, টিসিবি যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী এক কোটি কার্ড বিতরণ সম্পন্ন করে, তবে দেশের নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। তবে এই প্রক্রিয়ার সফলতা নির্ভর করবে ডেটা সংগ্রহের গতি, পণ্যের সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং বাজারের মূল্য সংবেদনশীলতার উপর।
ভবিষ্যতে টিসিবি যদি কার্ডের পরিধি বাড়িয়ে আরও পণ্য অন্তর্ভুক্ত করে, তবে গ্রাহকদের সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পাবে এবং সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা বাড়বে। তবে অতিরিক্ত পণ্য যুক্ত করার আগে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের সামঞ্জস্য বিবেচনা করা জরুরি, যাতে অতিরিক্ত স্টক বা ঘাটতি না হয়।
সামগ্রিকভাবে, টিসিবি কর্তৃক এখন পর্যন্ত ৭০ লাখ স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের বিতরণ দরিদ্র পরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। ডেটা সংগ্রহের ঘাটতি ও পণ্যের পরিমাণ বাড়ানোর দাবি সমাধান করা হলে, এই উদ্যোগের প্রভাব আরও বিস্তৃত ও টেকসই হতে পারে।
টিসিবি কর্তৃক পরিকল্পিত এক কোটি কার্ডের লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবশিষ্ট ডেটা সংগ্রহ, সরবরাহ শৃঙ্খলের মজবুতকরণ এবং পণ্যের পরিসর বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই পদক্ষেপগুলো সফল হলে, দেশের নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং সামগ্রিক বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।



