ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর বাংলাদেশ‑চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো‑২০২৬ উদ্বোধন ও বাংলাদেশ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জের লোগো উন্মোচন অনুষ্ঠানে দেশের পাসপোর্ট ও ভিসা জালিয়াতির ব্যাপারে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে জালিয়াতির শীর্ষস্থান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথি ও শিল্প প্রতিনিধিদের সামনে ড. ইউনূসের মন্তব্যের মূল বিষয় ছিল বিদেশি দেশের পাসপোর্ট গ্রহণে বাংলাদেশকে সম্মুখীন হওয়া সমস্যাগুলি। তিনি বলেন, বহু দেশ আমাদের পাসপোর্টকে বৈধ হিসেবে স্বীকার করে না এবং ভিসা জালিয়াতির ঘটনা বাড়ছে।
ড. ইউনূসের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে জালিয়াতি একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে; তিনি এটিকে “জালিয়াতির কারখানা” বলে বর্ণনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি আমাদের বুদ্ধি না থাকত তবে এই ধরনের জালিয়াতি করা সম্ভব হতো না, তবে এখন তা ভুল কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি যুক্তি দেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকান ভিসা জালিয়াতির খবরও মিডিয়ায় উঠে এসেছে, যা তার দাবিকে সমর্থন করে। ড. ইউনূসের মতে, জালিয়াতি করার দক্ষতা থাকা ব্যক্তিদের কাছে সৃজনশীলতা রয়েছে, যা তাদেরকে আরও জটিল প্রতারণা গড়ে তুলতে সক্ষম করে।
একটি উদাহরণ হিসেবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশের মন্ত্রীর সঙ্গে তার আলাপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে সেই দেশ আমাদের শ্রমিকদের প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না এবং বাংলাদেশী নাগরিকদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।
মন্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথনে তিনি জানেন, কিছু বাংলাদেশী ব্যক্তি ভ্রমণ অনুমতি পেতে নকল শিক্ষাগত সার্টিফিকেট ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ, এক মহিলা ডাক্তার তার ডিগ্রি নকল করে ভিসা পেতে চেয়েছিলেন, যদিও প্রকৃতপক্ষে তিনি গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে চেয়েছিলেন।
ড. ইউনূস এই বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে ব্যবহার না করা হয় তবে তা জালিয়াতির হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, না হলে দেশের সুনাম আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।
এজন্য তিনি দেশের অভ্যন্তরে জালিয়াতির মূল ভিত্তি কেটে ফেলতে হবে বলে আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, নকল পারমিশন, ব্যাংক সার্টিফিকেট এবং অন্যান্য নথি ব্যাপকভাবে প্রচলিত, যা সরকারী ও বেসরকারি সেক্টরে সমানভাবে প্রভাব ফেলছে।
ড. ইউনূসের মতে, প্রযুক্তি গ্রহণের সময় ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করা অপরিহার্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে জালিয়াতির কেন্দ্র নয়, বরং সঠিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে গর্বের সাথে দাঁড়াতে হবে।
এই বক্তব্যের পর, উপস্থিত বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকরা দেশের পাসপোর্ট ও ভিসা প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তারা উল্লেখ করেন, জালিয়াতি রোধে কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া, ডিজিটাল সিকিউরিটি ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
ড. ইউনূসের মন্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট, কারণ এটি বাংলাদেশ সরকারকে নথি যাচাই ও অভিবাসন নীতিতে ত্বরান্বিত সংস্কার করার চাপ বাড়িয়ে দেবে। পরবর্তী ধাপে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নথি ইস্যু করার মানদণ্ড কঠোর করা এবং জালিয়াতি সংক্রান্ত আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জালিয়াতি সমস্যার প্রতি তীব্র দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং প্রযুক্তি ব্যবহারকে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার ভিত্তিক করার আহ্বান জানিয়েছে, যা ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



