মধ্যপ্রাচ্যের আর্থিক কেন্দ্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (CBUAE) নতুন বায়োমেট্রিক পেমেন্ট পদ্ধতি পরীক্ষা শুরু করেছে। এই পাইলট প্রকল্পে গ্রাহককে আঙুলের ছাপ বা মোবাইল ফোনের দরকার না রেখে, মুখের চেহারা ও হাতের তালু স্ক্যান করে অর্থপ্রদান করা হয়। উদ্যোগটি দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টে প্রদর্শিত হচ্ছে, যেখানে প্রথম ব্যবহারকারীরা সরাসরি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে লেনদেন সম্পন্ন করছেন।
বায়োমেট্রিক সিস্টেমটি মুখের বৈশিষ্ট্য এবং হাতের তালুর রিডার ব্যবহার করে পরিচয় নিশ্চিত করে, ফলে ঐতিহ্যবাহী ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরতা কমে যায়। প্রযুক্তিটি প্রুফ‑অব‑কনসেপ্ট পর্যায়ে থাকলেও, ব্যবহারকারীরা বাস্তব সময়ে পেমেন্টের গতি ও নিরাপত্তা অনুভব করছেন। বর্তমানে পাইলটটি পরীক্ষামূলক ধাপে রয়েছে, এবং সাধারণ জনগণের জন্য কখনোয়ো সম্পূর্ণভাবে চালু হবে তা এখনও প্রকাশিত হয়নি।
এই উদ্যোগের বাস্তবায়নে নেটওয়ার্ক ইন্টারন্যাশনাল, এমিরেটস ইনস্টিটিউট অব ফাইন্যান্সের ইনোভেশন হাব এবং পপআইডি (PopID) প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে। নেটওয়ার্ক ইন্টারন্যাশনাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্যান্ডবক্স প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রকল্পকে নিরাপদ পরিবেশে পরীক্ষা করার সুযোগ দিচ্ছে। পপআইডি কোম্পানি মুখ ও তালু শনাক্তকরণের অ্যালগরিদম সরবরাহ করে, যা দ্রুত এবং সঠিক ভেরিফিকেশন নিশ্চিত করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জোর দিয়ে বলেছে যে, পাইলটটি বৃহৎ স্কেলে চালু করার আগে নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং পরিচালনাগত প্রস্তুতি মূল্যায়নের জন্য নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সম্পূর্ণ পরীক্ষা করা হবে। এই ধাপটি সম্ভাব্য ঝুঁকি কমিয়ে, ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষিত রাখার জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী সিস্টেমের স্কেলেবিলিটি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও নির্ধারিত হবে।
বায়োমেট্রিক পেমেন্টের সহকারী গভর্নর সাইফ হুমাইদ আল ধাহেরি উল্লেখ করেছেন, এই প্রযুক্তি নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহকের লেনদেনের অভিজ্ঞতাকে সহজ ও দ্রুত করবে। তিনি বলেন, মুখ ও তালু শনাক্তকরণে কোনো শারীরিক টোকেনের প্রয়োজন না থাকায় ব্যবহারকারীকে অতিরিক্ত সরঞ্জাম বহন করতে হবে না। ফলে দৈনন্দিন কেনাকাটায় সময় সাশ্রয় এবং গোপনীয়তা রক্ষার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
নেটওয়ার্ক ইন্টারন্যাশনালের সিইও মুরাত চাগরি সুজারও একই দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করেছেন, তিনি উল্লেখ করেন যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে প্রচলিত পেমেন্ট পদ্ধতির বিকল্প খুঁজছে। বায়োমেট্রিক পেমেন্টের স্বয়ংক্রিয়তা ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য ডিজিটাল বাণিজ্যের ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংক ও ফিনটেক কোম্পানিগুলো নতুন গ্রাহক সেগমেন্টে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপটি মধ্যপ্রাচ্যের আর্থিক সেক্টরে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। পূর্বে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা মোবাইল অ্যাপের ওপর নির্ভরশীল পেমেন্ট সিস্টেমগুলোকে তুলনায়, মুখ ও তালু ভিত্তিক পদ্ধতি অধিকতর সুরক্ষিত এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব বলে বিবেচিত। এছাড়া, এই সিস্টেমের মাধ্যমে জালিয়াতি ও ডেটা চুরি ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গ্রাহকদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, পেমেন্টের সময় আর কোনো পাসওয়ার্ড বা ওটিপি ইনপুট করতে হবে না; শুধুমাত্র মুখের দিকে তাকিয়ে বা হাতের তালু স্ক্যান করলেই লেনদেন সম্পন্ন হবে। এই সরলতা বিশেষ করে বয়স্ক বা প্রযুক্তি-সচেতন নয় এমন ব্যবহারকারীদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। একই সঙ্গে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত টার্মিনাল বা সফটওয়্যার আপডেটের প্রয়োজন কমে যাবে।
বাজারে ইতিমধ্যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার এবং মোবাইল পেমেন্ট অ্যাপের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে, তবে এই নতুন পদ্ধতি তাদের সীমাবদ্ধতা দূর করার লক্ষ্য রাখে। মুখের বৈশিষ্ট্য এবং তালুর রিডার দুটোই অনন্য এবং সহজে নকল করা কঠিন, ফলে নিরাপত্তা স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, ডেটা সংরক্ষণে এনক্রিপশন ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্য আধুনিক ক্লাউড সেবা ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এই পাইলটের সফলতা যদি নিশ্চিত হয়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্ভবত পুরো আরব যুক্তরাষ্ট্রে এই সেবা সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা করবে। এর ফলে রিটেল, রেস্টুরেন্ট, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং অনলাইন শপিংসহ বিভিন্ন সেক্টরে বায়োমেট্রিক পেমেন্টের ব্যবহার বাড়বে। এছাড়া, অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এই মডেল অনুসরণ করে নিজেদের পেমেন্ট সিস্টেমকে আধুনিকায়ন করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে বায়োমেট্রিক পেমেন্ট পাইলট চালু করেছে, তা নিরাপত্তা, ব্যবহারিকতা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। মুখ ও তালু শনাক্তকরণের মাধ্যমে লেনদেন সহজ করা হলে, আর্থিক সেবার প্রবেশযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ ত্বরান্বিত হবে। এই উদ্যোগের ফলাফল ভবিষ্যতে গ্লোবাল ফিনটেক প্রবণতাকে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।



