ঢাকা, ২৮ জানুয়ারি – সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সভাপতি এ কে আজাদ বুধবার ব্র্যাক সেন্টার ইন‑এ অনুষ্ঠিত ‘মিডিয়া সেলফ‑রেগুলেশন ইন বাংলাদেশ’ নীতি সংলাপে অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপের প্রশ্ন তুলেছেন। অনুষ্ঠানটি মিডিয়া রিসোর্সেস অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজন করেছে এবং গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনকে একত্রিত করেছে।
এ কে আজাদ উল্লেখ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, তবুও সরকার কেন বিচারিক স্বায়ত্তশাসনকে সীমাবদ্ধ রাখছে তা অস্বীকারযোগ্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার যদি নিজের সময়সীমা জানে, তবে তার ভয় কোথা থেকে আসছে এবং কেন বিচারিক প্রক্রিয়াকে অক্ষম করে তুলছে তা স্পষ্ট করা দরকার।
বক্তা আরও জানান, যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা প্রকাশিত হয়নি, তবুও ন্যায়বিচার প্রদান না করা এবং নিরীহ নাগরিকদের জেলে পাঠানোর ঘটনা বেড়ে চলেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এমন পরিস্থিতিতে সরকারী নীতি ও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগে গ্রেপ্তারের পদ্ধতি নিয়ে এ কে আজাদ সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, কিছু নিরীহ ব্যক্তিকে বাড়ি থেকে তুলে এনে পুলিশ উচ্চ জামানত দাবি করে, যার পরিশোধে সক্ষম হলে তারা থানা থেকে মুক্তি পায়, আর অক্ষম হলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জেলে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়া ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংলাপে অতীতের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সম্পর্কেও আলোচনা হয়। এ কে আজাদ উল্লেখ করেন, বিভিন্ন সরকারে সাংবাদিকদের ওপর দমনমূলক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রয়েছে এবং এই প্রবণতা পরিবর্তন না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা বিপন্ন থাকে। তিনি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন।
বক্তা বলেন, সরকারে যেই ব্যক্তি থাকুক না কেন, তাদের চরিত্রে মূল পার্থক্য কম। অতীতের সরকার, বর্তমানের সরকার এবং ভবিষ্যতের সরকার—তিনেরই নীতি ও কার্যক্রমে সমান রকমের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তিনি ভবিষ্যতে কোন পরিবর্তন আসবে তা নিশ্চিত করা কঠিন বলে মন্তব্য করেন।
এ কে আজাদ যুক্তি দেন, যদি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে সংস্কার করা না যায় এবং সমালোচনা করা নিষিদ্ধ করা হয়, তবে ‘ইথিক্যাল জার্নালিজম’ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীন ও নৈতিক সাংবাদিকতা বজায় রাখতে সরকারী নীতি ও বিচারিক স্বায়ত্তশাসনের সুরক্ষা অপরিহার্য।
সংলাপে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ এবং প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফসহ অন্যান্য মিডিয়া প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা মিডিয়া স্ব-নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে মতবিনিময় করেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এ ধরনের প্রকাশ্য আলোচনা সরকারী নীতি ও বিচারিক স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে সমতা রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। নোয়াবের এ কে আজাদের মন্তব্যের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি স্পষ্ট হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি সরকারী চাপ কমে এবং সমালোচনামূলক স্বর বজায় থাকে, তবে মিডিয়া স্ব-নিয়ন্ত্রণের কাঠামো শক্তিশালী হতে পারে।
সংলাপের সমাপ্তিতে অংশগ্রহণকারীরা মিডিয়া স্ব-নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করেন। এ কে আজাদ শেষ মন্তব্যে বলেন, বিচারিক স্বায়ত্তশাসন ও মিডিয়া স্বাধীনতা একসাথে না থাকলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং এই বিষয়গুলো সমাধান না হলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে অস্থিরতা বাড়তে পারে।



