ঢাকা শহরের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বুধবার অনুষ্ঠিত এক দিনের কর্মশালায় কৃষি উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী কৃষি খাতের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হিসেবে কৃষকদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে আর্থিক সহায়তা অপরিহার্য, না হলে খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে।
কর্মশালার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত চৌধুরী শিল্প ও ব্যাংকিং সেক্টরের কিছু কাঠামোগত সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, দেশের বেশ কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ সময়মতো পরিশোধ না করে, ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তরলতা কমে যায়। এই পরিস্থিতি সরাসরি কৃষকদের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, কারণ ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানে সতর্কতা অবলম্বন করে।
কৃষকদের জন্য ক্রেডিটের অভাবের ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায়। চৌধুরী উল্লেখ করেন, যখন ব্যাংক ঋণ দিতে হেসে ওঠে, তখন কৃষকরা প্রয়োজনীয় সেচ, সার ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে পারে না, ফলে উৎপাদন ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকে। এই চক্রটি কৃষি উৎপাদনের সামগ্রিক পরিমাণকে হ্রাস করে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে।
উল্লেখযোগ্য যে, উপদেষ্টা নিজেও এই খাতে দীর্ঘদিন কাজ করার পর ভবিষ্যতে আর সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারবে না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, কৃষি উন্নয়নের জন্য এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ না নিলে, পরবর্তী সময়ে এই সেক্টরের জন্য নতুন নীতি গঠন করা কঠিন হয়ে পড়বে। এই মন্তব্যটি শিল্প ও কৃষি সংযোগের গুরুত্বকে পুনরায় জোর দেয়।
চৌধুরী কৃষকদের দেশের মেরুদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যদিও এই কথাটি প্রায়শই মুখে বলা হয়, বাস্তবায়নে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি ইঙ্গিত করেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কৃষকদের জন্য কার্যকরী সহায়তা প্রোগ্রাম চালু করতে হবে, যাতে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে।
বাজারে ফসলের দাম যথেষ্ট না হলে কৃষকরা তাদের ফসল বিক্রি না করে ফেলে দিতে বাধ্য হন, এ বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেছেন। ফসলের অতিরিক্ত সরবরাহ ও মূল্যহ্রাসের ফলে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ে, যা তাদের আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে। চৌধুরী উল্লেখ করেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কৃষি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণকে হ্রাস করবে।
মিডিয়া সংস্থাগুলো এই সমস্যাগুলোকে সামান্য মাত্রায় তুলে ধরলেও, বাস্তবিক পরিস্থিতি আরও জটিল। চৌধুরী উল্লেখ করেন, কৃষকদের সমস্যার সমাধান না হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেমে যাবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কৃষি উন্নয়নের জন্য স্বাবলম্বী কৃষক গড়ে তোলা একমাত্র কার্যকরী কৌশল।
ব্যবসা ও বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, কৃষকদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা না থাকলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ ঝুঁকির মুখে পড়বে। ব্যাংকগুলো যদি ধারাবাহিকভাবে ঋণ প্রত্যাখ্যান করে, তবে কৃষি সেক্টরে বিনিয়োগের হার কমে যাবে, যা উৎপাদনশীলতা হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে। ফলে, দেশের মোট জিডিপি বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হবে।
অন্যদিকে, ফসলের দাম না পেয়ে ফেলে দেওয়া উৎপাদন অতিরিক্ত সরবরাহের সংকেত দেয়, যা বাজারে মূল্য অস্থিরতা বাড়ায়। এই অস্থিরতা কৃষি পণ্য রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। তাই, সরকারকে ন্যূনতম মূল্য নীতি বা বাজার হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে হলে, ক্রেডিট প্রবাহের উন্নতি, বাজারমূল্য সমন্বয় এবং উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা অপরিহার্য। বিশেষ করে, ব্যাংক ও আর্থিক সংস্থাগুলোকে কৃষি-নির্দিষ্ট ঋণ পণ্য তৈরি করে ঝুঁকি হ্রাসের ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে, সরকারী সাবসিডি ও বীমা স্কিমের মাধ্যমে কৃষকদের আয় সুরক্ষিত করা সম্ভব।
সারসংক্ষেপে, চৌধুরীর বক্তব্যে কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য আর্থিক স্বাবলম্বিতা, মূল্য স্থিতিশীলতা এবং নীতি সমর্থনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। যদি এই বিষয়গুলোতে দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে কৃষি উৎপাদন হ্রাস, ব্যাংকিং সেক্টরের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হবে। তাই, সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারকে সমন্বিতভাবে কাজ করে কৃষকদের স্বাবলম্বী করার কাঠামো গড়ে তোলা উচিত।



