আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড ২৬ জানুয়ারি ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা,কে একটি খোলা চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠিটি দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে মানবাধিকার সুরক্ষার জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। ক্যালামার্ডের মতে, এই সময়টি জনমতের আস্থা পুনরুদ্ধার, শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ সরকার পূর্বে ধারাবাহিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার আটক, নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক আচরণ দীর্ঘদিনের সমস্যার অংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ এবং সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক বিরোধী ও সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই লঙ্ঘনগুলো ঘটার পটভূমিতে নাগরিক পরিসরের সংকোচন, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের জন্য দায়মুক্তি গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। ক্যালামার্ডের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এমন পরিবেশে মানবাধিকার রক্ষার জন্য শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবুও তিনি উল্লেখ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এখনো একটি ব্যতিক্রমী সুযোগ রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্বীকার করেছে যে, বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক গুমের শিকারদের সুরক্ষার কনভেনশন এবং নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকল (ওপিসিএটি) রেটিফিকেশন এ তা অন্তর্ভুক্ত। এই রেটিফিকেশনগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ক্যালামার্ড জোর দিয়ে বলেন, কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য সময় ও দৃঢ় ইচ্ছা প্রয়োজন।
অধিকন্তু, তিনি উল্লেখ করেন যে, মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা, বিচারিক স্বতন্ত্রতা এবং নিরাপদ প্রতিবেদন পরিবেশের পুনর্গঠন জরুরি। তিনি সরকারকে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় গঠনমূলক সংলাপের আহ্বান জানান।
ক্যালামার্ডের চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচনের পূর্বে মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বৈধতা বজায় রাখার মূল শর্ত। তিনি বলেন, যদি সরকার এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়, তবে তা জনমতের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন অর্জনে সহায়ক হবে।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরকারকে অনুরোধ করেছে যে, গুম, নির্বিচার আটক এবং নির্যাতনের অভিযোগের উপর দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত চালু করা হোক। তদন্তের ফলাফল প্রকাশ এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনি দায়িত্বে টানা নিশ্চিত করা মানবাধিকার সংস্কারের ভিত্তি গঠন করবে।
এই চিঠি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। নির্বাচনের আগে মানবাধিকার বিষয়ক স্পষ্ট নীতি ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভোটারদের অংশগ্রহণের ইচ্ছা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, যদি এই চিঠিতে উল্লিখিত উদ্বেগগুলো উপেক্ষা করা হয়, তবে নির্বাচনের বৈধতা ও ফলাফলের প্রতি প্রশ্ন উঠতে পারে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ভবিষ্যতে সরকার ও সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা প্রদান করতে প্রস্তুত। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে মানবাধিকার রক্ষার জন্য বহুপক্ষীয় সহযোগিতা গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, ক্যালামার্ডের খোলা চিঠি বাংলাদেশ সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ইঙ্গিত দেয়। মানবাধিকার রক্ষার জন্য গৃহীত পদক্ষেপ, রেটিফিকেশন এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচনের পূর্বে এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সুনাম উভয়ই উন্নত হবে।



