২৪ বছর বয়সী তন্ময় আহমেদ, যিনি সৌদি আরবের হায়েল শহরের একটি টাইলস কারখানায় গাড়ি চালক হিসেবে কাজ করছিলেন, ৩০ ডিসেম্বর ক্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তার দেহ ২৯ দিন পর বাংলাদেশে পৌঁছায়; হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার দেউলা গ্রামে নিয়ে গিয়ে স্থানীয় রীতিনীতির অনুসারে দাফন করা হয়।
তন্ময়ের পরিবার জানায়, তিনি ছুটিতে দেশে ফিরে বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দেউলা গ্রামে বসবাসরত তার বাবা জাহিদুল ইসলাম ও মা তসলিমা বেগমের সঙ্গে, ধামিন কামনগর গ্রাম থেকে নির্বাচিত কনেয়ের সঙ্গে বিবাহের চূড়ান্ত আলোচনা চলছিল। কনের বাড়িতে ৩০০ জন বরযাত্রীর ব্যবস্থা, বিয়ের সামগ্রী কেনাকাটা এবং নতুন বাড়ির এক কক্ষে গদি, সোফা সহ আসবাবপত্র স্থাপনসহ সবকিছু প্রস্তুত ছিল। তন্ময় বিদেশে কাজের আয় দিয়ে গ্রামে একটি বাড়ি নির্মাণ করছিলেন, যা তার ভবিষ্যৎ পরিবারের জন্য ভিত্তি গড়ে তুলবে।
সৌদি আরবে তন্ময়ের কর্মজীবন ৪ বছর আগে শুরু হয়। তিনি হায়েল শহরের একটি টাইলস উৎপাদন কারখানায় গাড়ি চালিয়ে টাইলস বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন। দুর্ঘটনা ঘটে যখন ক্রেন থেকে টাইলসের স্তূপ গাড়ির ওপর পড়ে, ফলে তন্ময় সরাসরি আঘাত পেয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরে মৃত্যুর নিশ্চিত হয়। তার দেহকে হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়, এরপর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবারকে ফেরত পাঠানো হয়।
তন্ময়ের মা তসলিমা বেগম জানান, দুই দিন আগে তিনি ছেলের সঙ্গে শেষ কথা বলেছিলেন। তন্ময় বিদেশে কাজের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, জানুয়ারি ১৫ তারিখে দেশে ফিরে বিয়ের পরিকল্পনা করছিলেন এবং বউয়ের জন্য সোনা কিনে রেখেছিলেন। তার শেষ কথায় তিনি “মা, বিদেশে আরাম নেই, দেশে ফিরে বিয়ে করব” বলে উল্লেখ করেন।
এই ঘটনা বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের শ্রমিক নীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের আলোকে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। দু’দেশের মধ্যে বহু বছর ধরে শ্রমিক প্রেরণ চুক্তি রয়েছে; তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাজের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং দু’দেশের দূতাবাসের সূত্রে জানা যায়, নিরাপত্তা মানদণ্ডের উন্নয়ন এবং কর্মীদের জন্য জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য নতুন প্রোটোকল প্রণয়ন করা হচ্ছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা লক্ষাধিক, তাদের অধিকাংশই নির্মাণ ও গৃহস্থালী সেক্টরে কাজ করে। তন্ময়ের মতো দুর্ঘটনা শ্রমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি প্রকাশ করে, যা কূটনৈতিক স্তরে দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।” একই সঙ্গে, দু’দেশের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয়গুলো পুনরায় শ্রমিক রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া পর্যালোচনা এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক করার কথা বিবেচনা করছে।
তন্ময়ের দেহের দেশে পৌঁছানোর পর, পরিবার ও গ্রামবাসীরা স্থানীয় মসজিদে দোয়া ও শোকের অনুষ্ঠান আয়োজন করে। দেউলা গ্রামে সন্ধ্যায় দেহকে কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে, স্থানীয় রীতিনীতির অনুসারে দাফন করা হয়। দেহ গ্রহণের পরপরই স্বজনেরা তার শেষকৃত্যকে সম্মান জানিয়ে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশের আহ্বান জানায়।
এই শোকের ঘটনা বাংলাদেশের শ্রমিক সম্প্রদায়ের জন্য এক সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। সরকার ও কূটনৈতিক মন্ত্রণালয়কে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, কর্মস্থলের ঝুঁকি হ্রাসের জন্য কঠোর নিয়মাবলী প্রয়োগ করতে হবে। তন্ময়ের পরিবার এবং তার মতো বহু পরিবার এই ক্ষতির শিকার, যা কেবল ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং শ্রমিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
সৌদি আরবে তন্ময়ের মৃত্যুর পর, বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য কূটনৈতিক সেবা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার দ্রুততা বাড়ানোর দাবি বাড়ছে। দু’দেশের সরকারী সংস্থাগুলোকে একসাথে কাজ করে, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এধরনের দুঃখজনক ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হয়।



