গন্ধের বোতল থেকে এক-দুই স্প্রে করে ঘাড়ে লাগানো সাধারণ রীতি, তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে এই অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে হরমোন ব্যালেন্সে প্রভাব ফেলতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে’র বিজ্ঞানীরা বহু জনপ্রিয় পারফিউম ও কসমেটিক পণ্যে ফেথালেটের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন, যা এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে পরিচিত।
ফেথালেট হল এমন রাসায়নিক পদার্থ, যা গন্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করতে ব্যবহৃত হয়, তবে এরা শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের নকল বা বাধা সৃষ্টি করে এন্ডোক্রাইন ব্যাঘাতের কারণ হতে পারে। হরমোনের সংকেত পথগুলো সূক্ষ্ম এবং সামান্য পরিবর্তনও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জটিল প্রভাব ফেলতে পারে। এন্ডোক্রাইন সোসাইটি সহ বেশ কয়েকটি চিকিৎসা সংস্থা উল্লেখ করেছে যে, এ ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শ থাইরয়েডের কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
থাইরয়েড গ্ল্যান্ড দেহের বিপাক, শক্তি, মেজাজ এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি এই গ্ল্যান্ডের সংকেত বারবার ব্যাহত হয়, তবে তা তৎক্ষণাৎ লক্ষণ না দেখালেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাব জমা হতে পারে। ঘাড়ের ত্বক শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় পাতলা এবং রক্তনালীর ঘনত্ব বেশি, ফলে এখানে প্রয়োগ করা তরল দ্রুত রক্তপ্রবাহে শোষিত হয়। পারফিউম সরাসরি থাইরয়েডের কাছাকাছি স্প্রে করলে ফেথালেটের শোষণ বাড়ে, যা হরমোনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
গবেষকরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, একবারের ব্যবহার বা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানের জন্য সামান্য স্প্রে করা বিপজ্জনক নয়। সমস্যাটি দেখা দেয় যখন একই স্থানে, বিশেষ করে ঘাড়ে, নিয়মিত ও দীর্ঘ সময়ের জন্য গন্ধের স্প্রে ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের পুনরাবৃত্তি সংস্পর্শ হরমোনের স্বাভাবিক কাজকে ব্যাহত করে, বিশেষ করে যাঁদের থাইরয়েডের সমস্যায় ইতিমধ্যে ঝুঁকি রয়েছে বা হরমোনের সংবেদনশীলতা বেশি।
বৈজ্ঞানিক দলটি উল্লেখ করেছে যে, ফেথালেটের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে নির্ণয় করা এখনও চলমান গবেষণার বিষয়, তবে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে সতর্কতা অবলম্বন করা যুক্তিযুক্ত। পারফিউমের গন্ধের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
এই গবেষণার ফলাফলকে বিবেচনা করে, বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে পারফিউমের স্প্রে সরাসরি ঘাড়ে না দিয়ে পোশাকের উপরে বা কানের পেছনে প্রয়োগ করা ভাল। এভাবে গন্ধের প্রভাব বজায় থাকে, তবে ত্বকের মাধ্যমে রক্তে শোষণের সম্ভাবনা কমে। এছাড়া, গন্ধের ব্যবহার সীমিত করা এবং ফেথালেট মুক্ত পণ্য বেছে নেওয়া আরও নিরাপদ হতে পারে।
যারা থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন, যেমন হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজম, তাদের জন্য বিশেষভাবে এই সতর্কতা প্রাসঙ্গিক। হরমোনের অতিরিক্ত চাপ তাদের চিকিৎসার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে, তাই দৈনন্দিন রুটিনে গন্ধের ব্যবহার পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
গন্ধের শিল্পে ফেথালেটের ব্যবহার ব্যাপক, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ব্র্যান্ড বিকল্প উপাদান ব্যবহার শুরু করেছে। ভোক্তারা পণ্যের লেবেল পরীক্ষা করে ফেথালেটের উপস্থিতি আছে কিনা তা যাচাই করতে পারেন। ফেথালেটবিহীন বা কম ফেথালেটযুক্ত পণ্য বেছে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে হরমোনের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, পারফিউমের ব্যবহারকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে ব্যবহার পদ্ধতি ও ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন করা গুরুত্বপূর্ণ। গন্ধের আনন্দ উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের স্বাস্থ্যের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা চালিয়ে যাওয়া হবে, যাতে ফেথালেটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও নিরাপদ বিকল্প সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। বর্তমান পর্যায়ে, সচেতন ব্যবহারই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।
আপনার দৈনন্দিন গন্ধের রুটিনে কি কোনো পরিবর্তন আনার কথা ভাবছেন? গন্ধের স্প্রে কোথায় ও কতবার ব্যবহার করা হয়, তা নিয়ে একবার পুনরায় চিন্তা করা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।



