মণিক বন্দোপাধ্যায়ের ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘পাপেটের গল্প’‑এর প্রধান চরিত্র শশি ডাক্তার, ঔপনিবেশিক বাংলার গ্রাম্য পরিবেশে আধুনিক চিকিৎসা ও ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাসের সংঘর্ষকে প্রতিনিধিত্ব করেন। উপন্যাসের প্রথম দৃশ্যে শশি, কলকাতা থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক চিকিৎসক, নৌকায় গ্রাম ফিরে আসার পথে হরু নামের এক যুবকের মৃতদেহের সম্মুখীন হন; হরু বজ্রপাতের ফলে মারা গেছেন এবং বটগাছের গুঁড়িতে শুইয়ে আছে। নৌকা চালক গোবরধন ভুতের ভয় প্রকাশ করলেও শশি তার যুক্তি দিয়ে ভয়কে অস্বীকার করেন এবং বলেছিলেন, যদি তা ভুত হয় তবে আমি তা বাঁধে এনে আপনাকে দেখাব।
এই দৃশ্যটি শশি ডাক্তারকে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নায়ক হিসেবে স্থাপন করে, যেখানে তিনি গ্রামবাসীর অজ্ঞতা ও আধুনিক জ্ঞানের মধ্যে সেতুবন্ধনকারী হিসেবে কাজ করেন। মণিক বন্দোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিশিষ্ট লেখক, এই উপন্যাসে ঐ সময়ের সামাজিক দ্বন্দ্ব—প্রথা বনাম যুক্তি, ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিকতা বনাম পুরাতন রীতি, নগর ও গ্রামজীবনের পারস্পরিক বিরোধ, আধুনিক চিকিৎসা ও প্রচলিত উপায়ের টানাপোড়েন—কে চিত্রিত করেছেন।
উপন্যাসের দ্বিতীয় অধ্যায়ে শশি চরিত্রের দুই দিক স্পষ্ট করা হয়েছে। একদিকে তিনি কল্পনা, উত্সাহ ও রসিকতায় সমৃদ্ধ; অন্যদিকে তিনি গৃহস্থালি বুদ্ধি ও সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট। তার কল্পনাপ্রবণ দিকটি অধিকাংশ সময় গোপন থাকে এবং কেবল তার নিকটজনেরা তা উপলব্ধি করতে পারে।
শশি ডাক্তারকে গ্রাম্য সমাজে স্থাপনের পেছনে মণিকের উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে গ্রামবাসীর জীবনে পরিবর্তন আনা, তবে তা একইসাথে ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাসের সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি করা। শশি তার প্রশিক্ষণকালে অর্জিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে গ্রাম্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করেন, যা কখনো কখনো গ্রামবাসীর সন্দেহ ও বিরোধের মুখোমুখি হয়।
উপন্যাসে শশি ডাক্তারকে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যিনি নিজের পেশাগত দায়িত্বকে সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করেন। তিনি রোগীর শারীরিক অবস্থা ছাড়াও তার মানসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করে চিকিৎসা প্রদান করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তখনকার সময়ের বেশিরভাগ চিকিৎসকের তুলনায় অগ্রগামী বলে বিবেচিত হয়।
শশি চরিত্রের মাধ্যমে মণিক বন্দোপাধ্যায় আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের টানাপোড়েনকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন। শশি যখন গ্রাম্য লোকজনের ভয়কে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করেন, তখন তিনি শুধু রোগের শারীরিক দিকই নয়, সামাজিক ভয় ও অন্ধবিশ্বাসের চিকিৎসা করেও সফল হন।
গ্রাম্য পরিবেশে শশি ডাক্তার যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, তা মূলত দুই প্রকারের: রোগীর শারীরিক রোগের চিকিৎসা এবং গ্রামবাসীর মানসিক ভয়কে দূর করা। তার পদ্ধতি প্রায়শই ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে, যাতে রোগী ও তার পরিবার উভয়ই স্বস্তি পায়।
শশি ডাক্তারকে উপন্যাসে এমন এক মানবিক চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি নিজের পেশা ও মানবিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সচেষ্ট। তার হাস্যরস ও উত্সাহ তাকে গ্রাম্য সমাজে সহজে গ্রহণযোগ্য করে তোলে, যদিও তার আধুনিক পদ্ধতি কখনো কখনো প্রচলিত রীতির সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে।
মণিকের বর্ণনা অনুযায়ী শশি ডাক্তার গ্রাম্য জীবনের জটিলতা ও বৈচিত্র্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তিনি গ্রামবাসীর দৈনন্দিন সমস্যাগুলোকে শুধু চিকিৎসা নয়, সামাজিক সমাধানের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করেন। এভাবে তিনি গ্রাম্য সমাজের উন্নয়নে এক ধাপ এগিয়ে যান।
‘পাপেটের গল্প’ উপন্যাসের মাধ্যমে মণিক বন্দোপাধ্যায় আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের দ্বন্দ্বকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে শশি ডাক্তার এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার চরিত্রের মাধ্যমে পাঠককে দেখানো হয়েছে কীভাবে একটি আধুনিক চিকিৎসক গ্রাম্য সমাজে নিজের স্থান তৈরি করতে পারে।
শশি ডাক্তারকে উপন্যাসের মূল নায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যিনি গ্রাম্য পরিবেশে আধুনিক চিকিৎসা ও মানবিক সহানুভূতির মিশ্রণ ঘটিয়ে সমাজের পরিবর্তনে অবদান রাখেন। তার চরিত্রের বিশ্লেষণ পাঠকদেরকে ঔপনিবেশিক সময়ের গ্রাম্য জীবনের জটিলতা ও পরিবর্তনের পথে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
মণিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পাপেটের গল্প’ আজও বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ রচনায় গণ্য, এবং শশি ডাক্তার চরিত্রের মাধ্যমে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সমন্বয় কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এই উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠকরা ঔপনিবেশিক বাংলার সামাজিক কাঠামো, গ্রাম্য জীবনের বাস্তবতা এবং আধুনিক চিকিৎসকের ভূমিকা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পেতে পারেন।



