ড. মুহাম্মদ ইউনূস বুধবার (২৮ জানুয়ারি) দুপুরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬ (ডিডি আই এক্সপো‑২০২৬) উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করবে। এই মন্তব্যের পটভূমি হল ২০০৭ সালের জুলাই আন্দোলন, যা দেশের রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিবর্তনের সঞ্চার ঘটায়।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকার, চীনা দূতাবাস এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি সংস্থার প্রতিনিধিরা। ড. ইউনূসের বক্তব্যের মূল থিম ছিল ডিজিটাল খাতের সম্ভাবনা এবং ঐতিহাসিক আন্দোলনের শিক্ষাকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি ডিডি আই এক্সপো তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
ড. ইউনূস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “জুলাই আন্দোলনকারীরাই একদিন বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে।” তিনি যুক্তি দেন, ২০০৭ সালের ইন্টারনেট বন্ধের পর যে বিক্ষোভ গড়ে ওঠে, তা শক্তিশালী এক সরকারের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই ঐতিহাসিক উদাহরণকে তিনি বর্তমান ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে তুলনা করে দেখান, যেখানে প্রযুক্তি ভিত্তিক উদ্যোগগুলো দেশের গ্লোবাল অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।
ডিজিটাল খাতকে তিনি দেশের “মূল খাত” হিসেবে চিহ্নিত করেন। ড. ইউনূস বলেন, “ডিজিটাল খাতই বর্তমানে মূল খাত। কারণ এটি থেকেই পরিবর্তন আসবে। এ খাত থেকেই অন্যান্য সব খাত প্রভাবিত হবে।” তার মতে, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর উন্নয়ন কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করবে।
একই সময়ে তিনি দেশের জালিয়াতি সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ড. ইউনূস উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশ জালিয়াতিতে সেরা হয়েছে। এতে বিদেশে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রযুক্তি গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে জালিয়াতি বন্ধ না করলে আন্তর্জাতিক সুনাম পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।
ড. ইউনূসের মতে, জালিয়াতি নির্মূলের জন্য প্রযুক্তিগত সমাধান অপরিহার্য। তিনি বলেন, “প্রযুক্তিতে ভালো করতে হলে এই জালিয়াতি বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা মাথা উঁচু করে চলতে চাই। আমাদের সেই সামর্থ্য রয়েছে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরকারকে ডিজিটাল টুলসের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বৈশ্বিক কর্মসংস্থান নিয়ে তিনি একটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। ড. ইউনূস বলেন, “সবার জন্য চাকরি নিশ্চিতের ধারণা একটি ভুল জিনিস।” তিনি এটিকে “দাস প্রথার সামিল” হিসেবে উল্লেখ করে, উদ্যোক্তা সংস্কার ও বেসরকারি উদ্যোগকে সমর্থন করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সরকারকে সহায়তা প্রদান করতে হবে, এ কথায় তিনি স্পষ্ট করেন, “উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সরকারকে সহায়তা করতে হবে।” এই প্রস্তাবের মধ্যে তিনি আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও নীতিগত পরিবেশের উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্ত করেন, যা নতুন ব্যবসা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
সরকারি চাকরির মেয়াদ নিয়ে ড. ইউনূসের মতামতও উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, “সরকারি কর্মকর্তাদের পাঁচ বছরের বেশি সরকারি চাকরি করা উচিত নয়।” তার যুক্তি হল দীর্ঘমেয়াদী পদে থাকলে মানসিকতা স্থির হয়ে সৃজনশীলতা হ্রাস পায়।
এ বিষয়ে তিনি আরও যোগ করেন, “প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছর পর পর নতুন করে শুরু করা উচিত। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্য পরিবর্তন হলেও মানুষরা সেই প্রতিষ্ঠানে পুরোনো ধ্যান ধারণা নিয়ে বসে রয়েছে।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন ও নবায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ডিডি আই এক্সপোর উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে ড. ইউনূসের এই সব মন্তব্যের প্রভাব রাজনৈতিক আলোচনায় ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর জোর দিয়ে সরকার যদি জালিয়াতি ও কর্মসংস্থান নীতি সংশোধন করে, তবে তা আগামী নির্বাচনে ভোটারদের আস্থা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক সতর্ক করেছেন যে নীতিগত পরিবর্তন বাস্তবায়নে সময় ও রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি প্রয়োজন হবে।
সারসংক্ষেপে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য ডিজিটাল খাতকে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং জুলাই আন্দোলনের ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে শিখে আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। তিনি জালিয়াতি নির্মূল, কর্মসংস্থান নীতি সংস্কার এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানিয়ে, বাংলাদেশ সরকারকে প্রযুক্তি-ভিত্তিক স্বচ্ছ ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের পথে অগ্রসর হতে উৎসাহিত করেছেন।



