সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা জজ (১) আদালতে মঙ্গলবার বিকেলে একাধিক পরিবারের সদস্যসহ মোট দশজনকে হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। রায়ে বিচারক লায়লা শারমিনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর শামসুজ্জোহা শাহানশাহ রায়ের ঘোষণার দায়িত্ব নেন।
দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছে কামারখন্দ উপজেলার ময়নাকান্দি গ্রাম থেকে আসা আবু সাঈদ, তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম, এবং তাদের পুত্র মনির হোসেন। এছাড়াও একই গ্রাম থেকে সাহেব উদ্দিন, সোহেল রানা, শাহজাহান মণ্ডল, শফিকুল ইসলাম, এরশাদ শেখ, রমজান আলী এবং আবুল কালাম আজাদ নামের ব্যক্তিরা রায়ে শাস্তি পেয়েছেন।
রায়ের সময় ছয়জন অভিযুক্ত আদালতে উপস্থিত ছিলেন, বাকি চারজনকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি এবং তারা পলাতক অবস্থায় রয়েছেন। উপস্থিত নয় এমন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালত গৃহশর্ত আরোপের পাশাপাশি ভবিষ্যতে গ্রেফতার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এই মামলার মূল কারণ ২০১১ সালে বদিউজ্জামান নামে এক ব্যক্তি ময়নাকান্দি গ্রাম থেকে আলমের কাছ থেকে তিনশো বিগ্গা জমি ক্রয় করেন। তবে একই সময়ে প্রতিবেশী আবু সাঈদ তার বাড়ি দিয়ে ঐ জমি দখল করে নেয়। দখল প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধের পরেও অভিযুক্তরা হুমকি জানিয়ে সমস্যার সমাধান বন্ধ করে দেয়।
বদিউজ্জামান এবং আবু সাঈদের মধ্যে জমি সংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের সময়ও মতবিরোধ দেখা দেয়। এই দ্বন্দ্বের ফলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে এবং হিংসাত্মক সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
২৪ জুন ২০১১ সকালবেলায় বদিউজ্জামান জমির নথিপত্র নিয়ে আইনজীবীর কাছে যাওয়ার জন্য বাড়ি ছেড়ে যান, তবে তিনি আর কখনো বাড়ি ফিরে আসেন না। পরিবারের সদস্যদের অনুসন্ধানেও তার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না।
পরের দিন, ২৫ জুন, ময়নাকান্দি এলাকার একটি খালি মাঠে বদিউজ্জামানের গলাকাটা মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃতদেহের অবস্থান ও শারীরিক ক্ষতিগুলি তদন্তের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বদিউজ্জামানের স্ত্রী রতনা বেগম, যাকে সুফিয়া নামেও চেনা যায়, তার স্বামীকে হত্যা করার অভিযোগে একাধিক অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করে এবং অজানা সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের তদন্তের পর মোট দশজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। দীর্ঘমেয়াদী তদন্তে সাক্ষ্য, দস্তাবেজ এবং ফরেনসিক প্রমাণ একত্রিত করে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
বিচারক লায়লা শারমিনের নেতৃত্বে চলা বিচারকাজে প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়। রায়ে সকলকে জীবদ্দশা কারাদণ্ডের পাশাপাশি সম্পত্তি জব্দের আদেশও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্তরা রায়ের পর আপিলের অধিকার রাখে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় উচ্চতর আদালতে আপিল করতে পারে। আপিলের ফলাফল না জানার আগে, তাদের কারাবাস অব্যাহত থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে।
এই রায় স্থানীয় সমাজে শক সৃষ্টি করেছে, কারণ একাধিক পরিবারের সদস্য একসাথে নিহত হয়েছিল। বিচারিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি অপরাধের শিকার পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দিলেও, ভবিষ্যতে অনুরূপ জমি বিরোধ ও স্থানীয় নির্বাচনী সংঘর্ষে আইনগত পদ্ধতি অনুসরণ করার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে।



