বাংলাদেশ সরকার পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক নীতি দেশের অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়ন চাহিদা বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ছে এবং ঋণসেবা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজস্ব বাড়ানো অপরিহার্য, তবে তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে করা দরকার।
দেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৮-৯ শতাংশে আটকে রয়েছে, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্নের মধ্যে গণ্য হয়। এই নিম্ন অনুপাত সরকারকে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে বিনিয়োগের ক্ষমতা সীমিত করে।
অনেক বিশ্লেষক নতুন কর আরোপ বা হারের বৃদ্ধি প্রস্তাব করেন, তবে তা ইতিমধ্যে বৈশ্বিক ও দেশীয় চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই নতুন করের পরিবর্তে বিদ্যমান কর ব্যবস্থার কাঠামোকে শক্তিশালী করা অধিক টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা দুটি সমান্তরাল অর্থনীতির মতো কাজ করে। একটি ছোট গোষ্ঠী—প্রধানত বেতনভুক্ত কর্মী ও আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান—বড় অংশের করের বোঝা বহন করে, আর বৃহৎ সম্ভাব্য করদাতা গোষ্ঠী এখনও নেটের বাইরে।
জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কমই আয়কর রিটার্ন দাখিল করে। উচ্চ আয়সম্পন্ন পেশাজীবী, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, শহুরে সম্পত্তি মালিক এবং স্বনিয়োজিত উচ্চ আয়ের ব্যক্তিরা প্রায়শই হালকা কর বা কোনো কর না দিয়ে থাকে।
সরকারের রাজস্বের বড় অংশ উৎসে কর, রিগ্রেসিভ আমদানি শুল্ক এবং পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল, কারণ এগুলো সংগ্রহে তুলনামূলকভাবে সহজ। তবে এই পদ্ধতি করের ভারসাম্যহীনতা বাড়ায় এবং নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ দেয়।
বহু নাগরিক প্রশ্ন তোলেন, “আমার করের বদলে আমি কী পাচ্ছি?” সেবা মান, ন্যায়পরায়ণতা ও জবাবদিহিতা স্পষ্ট না হলে স্বেচ্ছায় কর প্রদান কমে যায়। তাই রাজস্ব সংগ্রহকে ব্যয় মান ও শাসনের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
নীতিগত বিকৃতি আরেকটি বড় বাধা। স্ট্যাটুটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও) ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় কর ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন, অস্বচ্ছ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এই অনিশ্চয়তা করদাতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায়।
বিনিয়োগকারীদের জন্য করের হার নয়, বরং নীতি প্রয়োগের সামঞ্জস্য ও পূর্বাভাসযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক ভ্যাট হার, সীমিত কর ভিত্তি এবং জটিল নিয়মাবলী বাজারকে অস্থির করে।
ভবিষ্যতে যদি সরকার করভিত্তি সম্প্রসারণে কাঠামোগত সংস্কার না করে, তবে রাজস্ব বাড়াতে নতুন কর আরোপের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সুতরাং, কর সংগ্রহের পদ্ধতি সহজতর করা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা এবং করদাতাদের জন্য পরিষ্কার সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং টেকসই বৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলবে।
অবশেষে, রাজস্ব সংগ্রহের সাথে ব্যয়ের গুণগত মানকে সমন্বয় করা না হলে স্বেচ্ছা করদানের হার বাড়বে না, এবং আর্থিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন কঠিন হবে।



