চাঁদপুরের মোবারকদি গ্রামে অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক অশোক কুমার রায় গত তিন বছর ধরে প্রতিদিন দু’বার, সকাল ও সন্ধ্যায়, প্রায় বিশ থেকে ত্রিশটি পথের কুকুরকে খাবার ও উষ্ণতা সরবরাহ করছেন। তিনি এই কাজটি ২০২৩ সালের শীতের এক রাতে, যখন শীতের তীব্রতা কুকুরগুলোকে কাঁপিয়ে তুলেছিল, শুরু করেন।
অশোক রায় পূর্বে মতলব সরকারি ডিগ্রি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন এবং এখন তার পরিবারসহ কলেজের আবাসিক এলাকায় বসবাস করছেন। কলেজের গেটের কাছাকাছি একটি মুদিদোকানের সামনে তিনি প্রায়ই কুকুরদের জটলা দেখেন, যাদের চোখে ক্ষুধা ও ঠাণ্ডার তীব্রতা স্পষ্ট।
এক রাতে তিনি গৃহে ফিরে গিয়ে দেখলেন, কয়েকটি কুকুর শীতের তাপমাত্রায় কাঁপছে এবং ক্ষুধার তাড়া করছে। সেই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে, ফলে তিনি কাছের দোকান থেকে কিছু পাউরুটি, বানরুটি ও বিস্কুট কিনে কুকুরগুলোকে খাওয়ালেন এবং পরে তাদের জন্য উষ্ণ কম্বল দিলেন। এই ছোট্ট সহায়তা তার জন্য একটি নতুন অভ্যাসের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমবারের পর থেকে অশোক রায় নিয়মিতভাবে প্রতিদিন দু’বার, সকাল দশটায় এবং সন্ধ্যায়, কুকুরদের খাবার দেন। তিনি স্থানীয় মুদিদোকান থেকে রুটি, বানরুটি ও বিস্কুট সংগ্রহ করে একে একে কুকুরদের মুখে দেন এবং কখনো কখনো তাদের পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা প্রদান করেন। তার এই রুটিনে প্রায়ই কলেজের শিক্ষার্থী ও আশেপাশের বাসিন্দারা নিঃশব্দে উপস্থিত হয়ে দৃশ্যটি পর্যবেক্ষণ করেন।
অশোক রায়ের মতে, শহরের রাস্তা ও গলিতে ঘুরে বেড়ানো কুকুরগুলো প্রায়ই উপেক্ষা ও নির্যাতনের শিকার হয়। তিনি উল্লেখ করেন, “প্রাণীদেরও অনুভূতি আছে, ক্ষুধা আছে, কষ্ট আছে; তাদের অবহেলা করা মানে মানবিকতা থেকে দূরে সরে যাওয়া।” এই বিশ্বাসই তাকে ধারাবাহিকভাবে কুকুরদের খাবার ও শীতকালীন পোশাক সরবরাহে অনুপ্রাণিত করে।
কেবলমাত্র তার বাড়ির কাছাকাছি নয়, রায় কলেজ গেট, নবকলস, কলাদী এবং আশেপাশের অন্যান্য এলাকায়ও কুকুরদের জন্য শুকনা খাবার রাখেন। শীতের সময় তিনি অতিরিক্ত কম্বল ও উষ্ণ পোশাক কুকুরদের গলায় জড়িয়ে দেন, যাতে তারা ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পায়। কখনো কখনো তিনি কিছু কুকুরকে বাড়িতে নিয়ে এসে, তাদের সন্তানসুলভভাবে যত্ন নেন।
তার এই কাজের পেছনে কোনো সরকারি সহায়তা বা দান সংস্থার অংশগ্রহণ নেই; সবকিছুই তার নিজস্ব উদ্যোগ ও স্বেচ্ছাসেবী মনোভাবের ফল। তিনি বলেন, “কুকুরকে খাবার দেওয়া, শীতের রাতে উষ্ণতা প্রদান করা আমাকে মানসিক শান্তি দেয়; এটি দান নয়, বরং প্রাণীর প্রতি আমার মমতা ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ।”
অশোক রায়ের এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা স্থানীয় সমাজে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা তার কাজকে উদাহরণ হিসেবে দেখে, কখনো কখনো নিজেরা খাবার বা কম্বল দিয়ে সহায়তা করে। আশেপাশের মানুষও তার উদ্যোগকে প্রশংসা করে এবং কুকুরদের প্রতি সহানুভূতি বাড়াতে উৎসাহিত করে।
প্রাণী কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের স্বেচ্ছাসেবী কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। শহুরে এলাকায় পথের কুকুরের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার, শীতকালীন সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অশোক রায়ের মডেলটি স্থানীয় প্রশাসন ও এনজিওদের জন্য একটি বাস্তবিক উদাহরণ হতে পারে, যেখানে কম সম্পদে বৃহৎ পরিসরে প্রাণী সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।
অবশেষে, অশোক রায়ের কাজের মূল বার্তা হল, “প্রাণীর প্রতি দয়া ও মমতা আমাদের সমাজের মানবিকতা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।” তার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা কেবল কুকুরদেরই নয়, মানব সমাজের নৈতিক দায়িত্ববোধকেও জাগিয়ে তুলছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ যদি এই ধরনের উদ্যোগে অংশ নেয়, তবে পথের কুকুরদের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে এবং শহরের পরিবেশও আরও সুরক্ষিত হবে।



