দক্ষিণ সুদানের জংগেলি রাজ্যের কিছু জেলার সীমান্তে সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাগরিকদের প্রতি ‘কোনো‑মানুষ‑বাঁচাবেন‑না’ রকমের হুমকি জানাতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার তীব্র নিন্দা পেয়েছে। এই মন্তব্যটি ডেপুটি আর্মি চিফ জেনারেল জনসন ওলুনি তার গোষ্ঠীকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন, যখন তারা বিরোধী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। জাতিসংঘের দক্ষিণ সুদান মিশনের প্রধান এই রকমের উস্কানিমূলক ভাষাকে ‘অত্যন্ত নিন্দনীয়’ বলে প্রকাশ করেছেন।
জাতিসংঘের মিশন প্রধানের মতে, বেসামরিক নাগরিক, শিশু, বয়স্ক এবং এমনকি পাখি‑পাখি পর্যন্ত লক্ষ্য করে এমন রেটোরিক্স আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন এবং তা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, কোনো ধরনের সহিংসতা যদি নাগরিকদের দিকে লক্ষ্য করে চালু হয়, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য অগ্রহণযোগ্য। এই উদ্বেগের পটভূমিতে জংগেলি রাজ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধবৃদ্ধি এবং বিশাল সংখ্যক শরণার্থীর প্রস্থান রয়েছে।
ডেপুটি আর্মি চিফ জেনারেল জনসন ওলুনি তার গোষ্ঠীকে একটি ভিডিওতে সরাসরি আদেশ দেন, যেখানে তিনি ‘বয়স্ক, শিশু, পাখি‑পাখি বা কোনো বাড়ি না রেখে সবকিছু ধ্বংস করুন’ বলে আহ্বান জানান। এই ভিডিওটি ফেসবুকে প্রকাশিত হওয়ার পর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সরকার এই বক্তব্যকে আনুষ্ঠানিক আদেশ হিসেবে অস্বীকার করে, তবে একই সময়ে সামরিক বাহিনীর কার্যক্রমে তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।
সরকারি সূত্রে জানানো হয় যে, ওলুনির মন্তব্যকে কোনো সামরিক আদেশ হিসেবে গণ্য করা হয়নি এবং তিনি কেবল সতর্কতা দিচ্ছিলেন। তবে একই সঙ্গে, সরকার জংগেলি রাজ্যের তিনটি জেলায় থাকা বেসামরিক ও জাতিসংঘ কর্মীদের তাত্ক্ষণিকভাবে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেয়, যাতে সম্ভাব্য সামরিক অভিযান থেকে তাদের রক্ষা করা যায়। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত সপ্তাহে, দেশের প্রতিরক্ষা প্রধানও জংগেলি অঞ্চলে ‘বিপ্লব দমন’ করার জন্য সাত দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ জয়লাভের আদেশ দেন। এই আদেশের পর থেকে বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ তীব্রতর হয়েছে এবং উভয় দিকের ক্ষতি বাড়ছে। সামরিক বাহিনীর এই আক্রমণাত্মক নীতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে।
ওলুনির ভিডিওতে তার ভাষ্য স্পষ্টভাবে ‘কোনো‑মানুষ‑বাঁচাবেন‑না’ বলে, যা বেসামরিক জনসংখ্যার ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। ভিডিওতে তিনি ‘বয়স্ক, শিশু, পাখি‑পাখি অথবা কোনো বাড়ি না রেখে সবকিছু ধ্বংস করুন’ এমন শব্দ ব্যবহার করেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নীতি লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রেকর্ডেড বক্তব্যের ফলে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অটেনি ওয়েক অটেনি জানিয়েছেন, সরকার বেসামরিক নাগরিকের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং ক্রসফায়ার থেকে বাঁচতে সতর্কতা জানাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, সরকার নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য পূর্বাভাসমূলক সতর্কতা প্রদান করছে এবং কোনো বেসামরিক ক্ষতি না হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
জাতিসংঘের দক্ষিণ সুদান মানবাধিকার কমিশন (UNCHRSS) জংগেলি রাজ্যের উত্তরে, জুবা রাজধানীর উত্তরে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফলে নাগরিকদের স্বেচ্ছায় জলের পুকুরে পলায়ন করতে বাধ্য হওয়ার কথা জানিয়ে ‘গুরুতর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। শরণার্থীরা জলে ভেজা মাটিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা মানবিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার জন্য তাত্ক্ষণিক সহায়তার আহ্বান তৈরি করেছে।
সংযুক্ত জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ফলে প্রায় ১,৮০,০০০ জন মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে শরণার্থী ক্যাম্পে বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছে। এই সংখ্যাটি পূর্বের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মানবিক সহায়তার চাহিদা তীব্রতর করেছে। শরণার্থীদের মৌলিক চাহিদা—খাবার, পানি, স্বাস্থ্যসেবা—সম্পূর্ণ করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অতিরিক্ত সম্পদ প্রয়োজন।
বিপক্ষের মধ্যে চলমান যুদ্ধের পটভূমিতে, রিক মাচার, যিনি দেশের স্থগিত ভাইস‑প্রেসিডেন্ট, তার সমর্থক বাহিনী সাম্প্রতিক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করেছে। মাচার বর্তমানে হত্যাকাণ্ড, দেশদ্রোহ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে বিচারে আছেন, যদিও তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করছেন। তার সমর্থক গোষ্ঠীর সাফল্য সরকারকে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, দক্ষিণ সুদানের এই সামরিক উত্তেজনা হুরিতান এবং ইথিওপিয়ার সীমান্তে চলমান সংঘর্ষের সঙ্গে সমান্তরালভাবে দেখা যায়, যেখানে উভয় দেশের সরকারই বেসামরিক নাগরিকের ওপর আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো এই দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তি গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হয়নি, এবং জাতিসংঘের শান্তি রক্ষাকারী মিশনও সীমিত ক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে।
এই পরিস্থিতিতে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দক্ষিণ সুদানের মানবিক সংকট নিয়ে বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করা হতে পারে, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে জরুরি মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক সমাধানের জন্য চাপ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং আরব লীগও এই সংঘর্ষের সমাধানে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব এবং সামরিক গতি দ্রুত হওয়ায় কোনো তাত্ক্ষণিক সমঝোতা অর্জন কঠিন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে, জংগেলি রাজ্যের তিনটি জেলায় বেসামরিক ও মানবিক কর্মীদের স্থানান্তর সম্পন্ন হওয়ার পর, সরকার সম্ভবত বৃহত্তর সামরিক অভিযান চালু করবে, যা আরও বড় মানবিক সংকটের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার গোষ্ঠী এই সম্ভাব্য ঘটনার পূর্বাভাসে তৎপরতা বজায় রেখে জরুরি সহায়তা পরিকল্পনা তৈরি করছে। শেষ পর্যন্ত, দক্ষিণ সুদানের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বেসামরিক নাগরিকের নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।



