ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টার্মার বৃহস্পতিবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন। এই সফরটি ২০১৮ সালের পর প্রথমবারের মতো কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চীন ভ্রমণ, এবং এতে প্রায় ষাটজন ব্রিটিশ ব্যবসা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের নেতার অংশগ্রহণ রয়েছে। স্টার্মার এবং তার দল ব্যাংক HSBC, ফার্মাসিউটিক্যাল জিএসকে, জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার এবং ন্যাশনাল থিয়েটারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সংযোগের নতুন দিক অনুসন্ধান করবে।
বেইজিং সফরের সময় শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হবে, যা যুক্তরাজ্যের চীন নীতি পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ডাউনিং স্ট্রিটের মতে, প্রধানমন্ত্রী মানবাধিকার ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোও উত্থাপন করবেন, যেখানে স্বার্থ ও মূল্যবোধের পার্থক্য দেখা দিলে চ্যালেঞ্জিং বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।
এই সফরের পেছনে যুক্তরাজ্যের সরকার চীন সঙ্গে কৌশলগত ও ধারাবাহিক সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য রাখে, কারণ চীন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় খেলোয়াড়। তবে সমালোচকরা যুক্তি দেন যে চীনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবাধিকার রেকর্ডে বড় পার্থক্য রয়েছে, ফলে সরকারকে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
চীনের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা অব্যাহত, বিশেষ করে শিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর করা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হংকংয়ের গণতান্ত্রিক মিডিয়া তায়ক জিমি লাইয়ের ওপর কঠোর আইনি পদক্ষেপ, যার ফলে তিনি আজীবন কারাদণ্ডের মুখোমুখি, তা যুক্তরাজ্যের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
সিকিউরিটি দিক থেকে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা MI5 সম্প্রতি চীনা রাষ্ট্রীয় অপারেটিভদের দৈনন্দিন জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই প্রসঙ্গে ডাউনিং স্ট্রিটের প্রতিনিধিরা সফরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে জোর দিয়ে বলেছেন, তবে চীনকে অন্ধভাবে স্বাগত জানানো নয়, বরং বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে স্টার্মার উল্লেখ করেন যে, বছরের পর বছর চীনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের নীতি উষ্ণ ও শীতল উভয় পর্যায়ে গিয়েছে, তবে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য চীনকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তিনি যুক্তি দেন যে কৌশলগত ও ধারাবাহিক সম্পর্ক গড়ে তোলা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তবে তা চীনের চ্যালেঞ্জিং আচরণকে অগ্রাহ্য করার অর্থ নয়।
বাণিজ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রধান পিটার কাইল এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সচিব লুসি রিগবি এই সফরে স্টার্মারের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাদের অংশগ্রহণ ব্যবসা ও শিল্পক্ষেত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে চীন সম্পর্কিত আলোচনা সমৃদ্ধ করবে এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ সুযোগগুলো চিহ্নিত করতে সহায়তা করবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে এই সফর যুক্তরাজ্যের চীন নীতি পুনর্গঠনে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে, তবে মানবাধিকার ও গোয়েন্দা হুমকি সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। ভবিষ্যতে চীন সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি, প্রযুক্তি বিনিময় এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বাড়তে পারে, তবে তা সমান্তরালভাবে নৈতিক ও নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
সফরের ফলাফল কীভাবে যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে স্টার্মার ও তার দল চীনের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করবে। এই প্রচেষ্টা যুক্তরাজ্যের চীন সম্পর্কের পুনর্নির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।



