বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬) প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলো মোট ২১,০০০ কোটি টাকার বেশি কৃষি ঋণ প্রদান করেছে। এই পরিমাণ পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪,৭৪৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দেশের মোট লক্ষ্যকৃত ৩৯,০০০ কোটি টাকার প্রায় অর্ধেকের বেশি, সুনির্দিষ্টভাবে ৫৩.৮৭ শতাংশ পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পুরো অর্থবছরের জন্য কৃষি ঋণের লক্ষ্যকে মোট নিট ঋণের ২.৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যা বর্তমান চাহিদার তুলনায় কম বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ঋণ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। প্রথমার্ধে ব্যাংকগুলো ২১,৭৭৪ কোটি টাকার ঋণ আদায় করেছে, যা পূর্ববছরের একই সময়ে ১৯,১১৭ কোটি টাকার তুলনায় ২,৬৫৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ ১৩.৯০ শতাংশ বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
ডিসেম্বর মাসের শেষে কৃষি খাতে মোট ঋণব্যালান্স ৬২,৭২৩ কোটি টাকার স্তরে পৌঁছেছে। যদিও সংগ্রহের হার উন্নত হয়েছে, তবু ঋণব্যালান্সের আকার নির্দেশ করে যে কৃষকদের আর্থিক চাহিদা এখনও পূরণ হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করেছে যে, নিট ঋণের মাত্র ২.৫ শতাংশকে কৃষি খাতে বরাদ্দ করা বর্তমান চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের প্রয়োজন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত তহবিলের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
ঋণ সীমিত থাকলে কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিক সেচ ব্যবস্থা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হয়। বীজ, সার ও সেচের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ঘাটতি ফলন হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ায়।
এছাড়া, জলবায়ু সহনশীল কৃষি পদ্ধতি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা কমে গেলে, দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে, ঋণ বিতরণের হার বাড়িয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সম্পদ সরবরাহ করা জরুরি।
বাজার বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি ঋণ লক্ষ্যকে মোট নিট ঋণের ২.৫ শতাংশের উপরে তোলা হয়, তবে কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং গ্রামীণ আয়ের উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে, অতিরিক্ত ঋণ প্রদানেও ঝুঁকি রয়েছে, যেমন ঋণ ডিফল্টের হার বাড়া।
সুতরাং, ঋণ নীতি নির্ধারণে সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। ঋণ প্রদান এবং সংগ্রহের মধ্যে সুষমতা বজায় রেখে, কৃষকদের প্রকৃত চাহিদা মেটাতে লক্ষ্যভিত্তিক তহবিল বরাদ্দ করা উচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাকি ছয় মাসে লক্ষ্যকৃত ৩৯,০০০ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ইতিমধ্যে বিতরণ হয়েছে। অবশিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য ব্যাংকগুলোকে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে।
কৃষি খাতে আর্থিক প্রবাহ বাড়লে, আধুনিক যন্ত্রপাতি, সঠিক বীজ ও সার, এবং সেচের উন্নত পদ্ধতি গ্রহণ সহজ হবে। ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে, আয় বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
সংক্ষেপে, প্রথমার্ধে কৃষি ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও, বর্তমান লক্ষ্য এবং চাহিদার মধ্যে পার্থক্য রয়ে গেছে। যথাযথ নীতি সমন্বয় এবং লক্ষ্যভিত্তিক তহবিল বরাদ্দের মাধ্যমে এই ফাঁক পূরণ করা সম্ভব, যা দেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।



