বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আগামী মাসে স্বয়ংক্রিয় লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। নতুন সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেলে ঘটমান সব ধরনের আর্থিক লেনদেন রিয়েল‑টাইমে বিশ্লেষণ হবে এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ তৎক্ষণাৎ শনাক্ত হবে।
প্রো অ্যাকটিভট্রানজেকশন মনিটরিং সিস্টেম (পিটিএমএস) নামক এই প্রযুক্তি, বেনামি ঋণ, ঋণের অপব্যবহার, ঋণপত্র জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের মতো অপরাধকে তৎক্ষণাৎ ধরা পড়ার লক্ষ্য রাখে। স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম লেনদেনের প্যাটার্ন তুলনা করে অস্বাভাবিকতা সনাক্ত করে, ফলে মানবিক ত্রুটি ও দেরি কমে যায়।
সিস্টেমটি কেবল ঋণ সংক্রান্ত নয়, নগদ জমা‑উত্তোলার বড় পরিমাণ, শেয়ার বাজারের অস্বাভাবিক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্সের সন্দেহজনক প্রবাহও পর্যবেক্ষণ করবে। ফলে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা দ্রুত তদন্ত শুরু করতে পারবে এবং অপরাধী প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।
মোবাইল ব্যাংকিং ও এফটিএস (MFSS) সেবাকেও ধীরে ধীরে পিটিএমএসের আওতায় আনা হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তৃত পরিসরে নজরদারি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা বর্তমানে সীমিত চ্যানেলে সীমাবদ্ধ।
বর্তমানে, সন্দেহজনক লেনদেন বা স্ট্র (STR) সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব প্রধানত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। বিএফআইইউকে রিয়েল‑টাইমে কোনো লেনদেনের অবস্থা জানার কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া না থাকায়, তথ্যের ফাঁক তৈরি হয়।
বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের নগদ জমা‑উত্তোলার পরিমাণ এক লক্ষ টাকা বা তার বেশি হলে ব্যাংককে ক্যাশ ট্রানজেকশন রিপোর্ট (CTR) দাখিল করতে হয়। এই রিপোর্ট প্রতি মাসের ২২ তারিখে বিএফআইইউতে জমা দিতে হয়। একই সঙ্গে, সন্দেহজনক লেনদেনকে স্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে তা অবিলম্বে জানাতে হয়।
তবে, বাস্তবে বেশিরভাগ ব্যাংক কেবলমাত্র রুটিন রিপোর্টই জমা দেয় এবং গুরুতর আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে রিপোর্টিং কমে যায়। এই ঘাটতি দুর্নীতি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লেনদেন গোপন রাখার সুযোগ দেয়।
বিএফআইইউ এই ফাঁক পূরণের জন্য পিটিএমএসকে স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলেছে। সিস্টেমের নাম ‘প্রো অ্যাকটিভট্রানজেকশন মনিটরিং সিস্টেম (পিটিএমএস) অথবা আগাম সতর্কতামূলক লেনদেন নজরদারি পদ্ধতি’ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে প্রথমে তেরটি ব্যাংকে চালু হবে।
প্রারম্ভিক পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী তেরটি ব্যাংক হল: ঢাকা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইস্লামিক ব্যাংক, সাউদার্ন ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, পাবলিক ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইউসিএফ ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রগতি ব্যাংক এবং গ্লোবাল ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে সব ব্যাংককে এই সিস্টেমে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পিটিএমএসের কার্যকরী চালু হওয়ার ফলে সন্দেহজনক লেনদেনের শনাক্তকরণ সময় কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক মিনিটে কমে যাবে। তদুপরি, স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রোঅ্যাকটিভভাবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করতে সহায়তা করবে এবং আর্থিক বাজারের স্বচ্ছতা বাড়াবে।
বিএফআইইউ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্ট্রের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে এর ৮০ শতাংশই সাধারণ ব্যাংকিং লেনদেনের সাথে সম্পর্কিত। বাণিজ্যিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ পাচার বা ঋণপত্র জালিয়াতি এখনো পর্যাপ্তভাবে সনাক্ত করা যায়নি, যা পিটিএমএসের মূল লক্ষ্য।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক অপরাধের হার কমাবে এবং আন্তর্জাতিক মানের মানদণ্ডে বাংলাদেশের আর্থিক সেক্টরের প্রতিযোগিতা বাড়াবে। তবে, সিস্টেমের সঠিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোর ডেটা শেয়ারিং ও সম্মতি বাড়ানো জরুরি। ভবিষ্যতে পিটিএমএসকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং দিয়ে সমৃদ্ধ করা হলে, জটিল লেনদেনের প্যাটার্নও দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।



