দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাক্তন প্রথম স্ত্রীর বিরুদ্ধে এই সপ্তাহে গৃহবিচার আদালতে প্রথম দফার রায় শোনার জন্য বিশাল জনসাধারণের আগ্রহ দেখা যাবে। ৫২ বছর বয়সী কিম কিয়ন‑হি, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ইউন সুক‑ইয়োলের স্ত্রীর ওপর ঘুষ, শেয়ার মূল্যের জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে। তিনি আগস্টে গ্রেফতারের পর থেকে জেলখানায় রয়েছেন এবং এখন আদালতে তার দোষারোপের প্রথম রায়ের অপেক্ষা করছেন। রায়ের পর দুইটি অতিরিক্ত মামলায় তার বিচার চলবে।
এই রায় শোনার দিনটি আদালতের সরাসরি সম্প্রচারে প্রকাশিত হবে, যা দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো রাষ্ট্রপতির সঙ্গী জেলখানায় থাকাকালীন অভিযুক্ত হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করবে। বিচারক কোর্টরুমে উপস্থিত সকলকে সতর্কভাবে শুনবেন এবং রায়ের বিষয়বস্তু জনসাধারণের সামনে সরাসরি তুলে ধরা হবে।
প্রসিকিউশন দাবি করে যে কিম কিয়ন‑হি ২০১০ অক্টোবর থেকে ২০১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডয়েচ মোটর্স নামে একটি বিএমডব্লিউ ডিলারশিপের শেয়ার মূল্যের জালিয়াতিতে অংশ নিয়ে ৮০০ মিলিয়ন ওন (প্রায় ৫৫২,৫৭০ ডলার) লাভ করেছেন। এই স্কিমে তিনি শেয়ার মূল্যের কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে বিক্রি করে নিজের এবং সহকর্মীদের জন্য অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করেন।
অধিকন্তু, তাকে ইউনিফিকেশন চার্চের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার বদলে বিলাসবহুল চ্যানেল হ্যান্ডব্যাগ, হীরা নেকলেস এবং মোট ৮০ মিলিয়ন ওন মূল্যের অন্যান্য উপহার গ্রহণের অভিযোগও আনা হয়েছে। এই উপহারগুলোকে ঘুষের রূপে গণ্য করে প্রসিকিউশন আদালতে উপস্থাপন করেছে।
প্রসিকিউশন আরও উল্লেখ করেছে যে ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে কিম কিয়ন‑হি রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী মিউং তে‑কিয়ুনের কাছ থেকে ৫৮টি বিনামূল্যের মতামত জরিপ পেয়েছেন, যার মোট মূল্য প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ওন। এই জরিপগুলোকে নির্বাচনী সুবিধা অর্জনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
কিমের স্বামী ইউন সুক‑ইয়োলেরও একই সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ন্যায়বিচার বাধা দেওয়ার অভিযোগে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তার শাস্তি মূলত সামরিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ছিল, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কিমের রায় শোনার সময় তার স্বামীর শাস্তি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে।
কিম কিয়ন‑হি ১৯৯৯ সালে সুকমিয়ং মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিল্প শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা নৈতিকতা কমিটি ২০২৫ সালে তার থিসিসে নকলের প্রমাণ পেয়ে ডিগ্রি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের পর থেকে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
শিক্ষা জীবনের আগে কিম ২০০৯ সালে কোভানা কন্টেন্টস নামে একটি শিল্প প্রদর্শনী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং বর্তমানে তার সিইও ও প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত আছেন। সংস্থাটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্পীদের কাজকে প্রদর্শনের জন্য বিভিন্ন প্রদর্শনী আয়োজন করে চলেছে।
কোভানা কন্টেন্টসের পাশাপাশি কিমের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গাড়ি ডিলারশিপ এবং ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে অংশীদারিত্বের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে, যদিও তার সরাসরি অংশগ্রহণের মাত্রা স্পষ্ট নয়। ২০১৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার মিডিয়া তার ব্যবসায়িক সম্পর্কের কিছু দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, তবে তা পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এই মামলায় কিমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ঘুষের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়া এবং নির্বাচনী সময়ে মতামত জরিপের অপব্যবহার দেশের রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে রায়ের ফলাফল কিমের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং তার স্বামীর রাজনৈতিক পার্টির অবস্থানকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। রায় যদি দোষী হয়, তবে তার উপর আরোপিত শাস্তি এবং সম্পত্তি জব্দের সম্ভাবনা রয়েছে, যা তার ব্যবসায়িক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অপরদিকে, রায় যদি নির্দোষ হয়, তবে এটি তার এবং তার স্বামীর রাজনৈতিক বিরোধীদের জন্য একটি বড় জয় হিসেবে বিবেচিত হবে এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশলে প্রভাব ফেলতে পারে। আদালতের পরবর্তী দুইটি মামলায় একই ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে রায় শোনার সম্ভাবনা রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, কিম কিয়ন‑হির বিচার দেশের রাজনৈতিক সংস্কার এবং দুর্নীতিবিরোধী নীতি বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। রায়ের পরিণতি কী হবে তা এখনও অনিশ্চিত, তবে এই প্রক্রিয়া দেশের আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।



