১৪ অক্টোবর ভেনেজুয়েলা উপকূলে একটি নৌকা আক্রমণ করে দুই ট্রিনিডাডের নাগরিকের মৃত্যু ঘটার পর, তাদের আত্মীয়স্বজনরা ওয়াশিংটন ডি.সিতে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। বস্টনের ফেডারেল আদালতে দায়ের করা মামলাটি ডেথ অন দ্য হাই সি অ্যাক্টের অধীনে করা হয়েছে, যা সমুদ্রের ওপরে অবৈধ মৃত্যুর জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করার অনুমতি দেয়। মামলায় চ্যাড জোসেফ এবং রিশি সামারু নামের দুই তরুণের মা ও বোনের প্রতিনিধিত্বে আইনজীবীরা দাবি করছেন যে আক্রমণটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং কোনো সামরিক সংঘাতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
মামলার মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে যে মার্কিন সরকার যদি এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের সন্দেহ পেত, তবে তাকে গ্রেফতার, অভিযোগ এবং জেলখানায় রাখা উচিত ছিল, না যে তাকে সমুদ্রের ওপরে গুলি করে হত্যা করা হয়। জোসেফের মা স্যালি কার কোরাসিংহ এই দৃষ্টিকোণটি জোর দিয়ে বলেছেন যে “যদি মার্কিন সরকার তার পুত্রকে অপরাধী বলে মনে করে, তবে তাকে গ্রেফতার করে বিচার করা উচিত, হত্যা করা নয়”।
এই আক্রমণটি মোট ৩৬টি নৌকায় মার্কিন নৌবাহিনীর হস্তক্ষেপের অংশ, যা সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবিয়ান ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘটেছে এবং ১২০ের বেশি মানুষকে প্রাণ হারাতে বাধ্য করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এই অপারেশনগুলোকে “নারকো-সন্ত্রাসী”দের লক্ষ্য করে চালু করেছে, যাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন যে মার্কিন সরকার এই কার্যক্রমকে অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘর্ষ হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ।
মামলাটি ডেথ অন দ্য হাই সি অ্যাক্টের অধীনে দায়ের করা হয়েছে, যা বিদেশি নাগরিকদেরকে মার্কিন আদালতে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের জন্য মামলা করার অনুমতি দেয়। এই আইনটি ১৯২১ সালে গৃহীত হয় এবং সমুদ্রের ওপরে ঘটিত দুর্ঘটনা বা অবৈধ কাজের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। আইনজীবীরা যুক্তি দিচ্ছেন যে জোসেফ ও সামারু কোনো সামরিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেননি, তাই তাদের মৃত্যুকে “অবৈধ হত্যা” হিসেবে গণ্য করা উচিত।
মার্কিন পেন্টাগন এখনও এই মামলায় কোনো মন্তব্য করেনি। তবে একই ধরনের একটি মামলা পূর্বে কলম্বিয়ার একজন নাগরিকের পরিবার ইন্টার-আমেরিকান কমিশন অন হিউম্যান রাইটসের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে তারা মার্কিন নৌবাহিনীর আক্রমণকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এই ধারাবাহিক আইনি পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মার্কিন সামরিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের সামঞ্জস্যতা নিয়ে বিতর্ক উস্কে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে এই মামলাগুলো মার্কিন সরকারের নৌবাহিনীর আক্রমণ কৌশলকে আন্তর্জাতিক আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে ক্যারিবিয়ান ও ল্যাটিন আমেরিকায় নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সরকার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ধরনের আক্রমণকে অবৈধ বলে দাবি করছে।
অধিকন্তু, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রবার্ট হ্যামিল্টন বলেন, “যদি মার্কিন সরকার নৌবাহিনীর আক্রমণকে অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘর্ষ হিসেবে উপস্থাপন করে, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে বৈধতা পাবে না, কারণ লক্ষ্যবস্তু নৌকা ও তার ক্রু কোনো সামরিক হুমকি নয়”। তিনি আরও যোগ করেন যে ডেথ অন দ্য হাই সি অ্যাক্টের অধীনে দায়ের করা মামলাগুলো ভবিষ্যতে মার্কিন নৌবাহিনীর অপারেশনাল নীতি পরিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে।
মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে যে জোসেফ ও সামারু ভেনেজুয়েলায় মাছ ধরা ও কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিলেন এবং ট্রিনিডাড ও টোবাগো ফিরে যাওয়ার পথে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তাদের পরিবার দাবি করে যে তারা কোনো অবৈধ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং শুধুমাত্র কাজের জন্য সমুদ্রের পথে ছিলেন।
এই আইনি পদক্ষেপের ফলে মার্কিন সরকারকে আন্তর্জাতিক আদালতে তার নৌবাহিনীর কার্যক্রমের বৈধতা প্রমাণ করতে হবে। যদি আদালত এই মামলায় পরিবারদের পক্ষে রায় দেয়, তবে ভবিষ্যতে মার্কিন নৌবাহিনীর সমুদ্রের ওপরে আক্রমণ সীমিত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অধিকতর স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বজায় রাখতে হবে।
মার্কিন সরকারের এই আক্রমণগুলোকে “নারকো-সন্ত্রাসী” হিসেবে চিহ্নিত করা এবং তা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা, তা এখন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার সংস্থার নজরে। এই মামলাগুলো ভবিষ্যতে সমুদ্রের ওপরে সংঘটিত সশস্ত্র কার্যক্রমের আইনি কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে পারে।
মামলার পরবর্তী পর্যায়ে আদালত কী রায় দেবে এবং মার্কিন সরকার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়াবে। এই মামলাটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ টেস্টবেড হিসেবে বিবেচিত হবে।



