বাংলাদেশে প্রেসক্রিপশন ওষুধের বিক্রয় বৃদ্ধির হার এখন এক অঙ্কে নেমে এসেছে, যা কোভিড‑১৯ পূর্বের দ্বি‑অঙ্কের ধারাবাহিকতা শেষ করেছে। উৎপাদন খরচের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি একসাথে বাজারকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে।
বহু নিম্ন-আয়ের পরিবার এখন অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত ওষুধের ক্রয় কমিয়ে দিচ্ছে, আর কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি উচ্চ ইনপুট খরচের কারণে লাভের মার্জিন হ্রাস পেয়ে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের উৎপাদন বন্ধ করেছে।
ওষুধ প্রস্তুতকারকরা জানাচ্ছেন যে, উৎপাদন খরচ বাড়লেও দাম বাড়াতে কঠোর নিয়ন্ত্রক অনুমোদন প্রয়োজন, যা রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার মুখে প্রায়শই প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়। ২০২৩ সালে সরকার সীমিত মূল্য বৃদ্ধি অনুমোদন করলেও, গত বছর জমা দেওয়া অধিকাংশ আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। টাকার তীব্র অবমূল্যায়নও আমদানি করা কাঁচামালের দামের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রেসক্রিপশন ডেটা ট্র্যাক করা আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা IQVIA অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে প্রেসক্রিপশন ওষুধের মোট বিক্রয় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৭,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে গত বছর বিক্রয় ১৫ শতাংশ বেড়েছিল, যা মহামারীর পূর্বে গড় বার্ষিক বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রোগীদের জন্য এই ধীরগতি মানে সম্পূর্ণ চিকিৎসা বন্ধ নয়, বরং প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধের মধ্যে পার্থক্য করা। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ইত্যাদি দীর্ঘস্থায়ী রোগের ওষুধ এখনও অগ্রাধিকার পায়, তবে সহায়ক বা অতিরিক্ত ওষুধের ব্যবহার কমে গেছে। মুদ্রাস্ফীতি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ৮ শতাংশের উপরে থাকায় গৃহস্থালির বাজেট সংকুচিত হয়েছে।
চট্টগ্রামের এক বয়স্ক রোগী হোসনে আরা বেগম বলেন, তিনি এখন কেবল প্রয়োজনীয় ওষুধই কিনে নেন। তিনি নিয়মিত কোলেস্টেরল ওষুধ নেন, তবে বুস্টার ও গ্যাস্ট্রিক ওষুধ প্রায়শই বাদ দেন। “ওষুধের দাম আমাদের পরিবারের জন্য বড় বোঝা, আমার ছেলে ছয়জনের পরিবারের খরচ সামলায়। দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই, তাই কিছু ওষুধ বাদ দিতে হচ্ছে,” তিনি জানান।
এই পরিস্থিতিতে রোগীর স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও মূল্য বৃদ্ধি অনুমোদনের প্রক্রিয়া কঠোর, তবু সময়মত ও যুক্তিসঙ্গত সমন্বয় রোগীর আর্থিক চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং উৎপাদন দক্ষতা উন্নত করা খরচ হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের জন্যও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। উৎপাদন খরচের ওঠানামা, মুদ্রা অবমূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক বাধা মোকাবিলার জন্য মূল্য নির্ধারণের নমনীয়তা, সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্য এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
অবশেষে, রোগী ও পরিবারকে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্য বীমা বা সরকারি সহায়তা পরিকল্পনা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা দরকার। এভাবে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও খরচের চাপের মাঝেও রোগীর চিকিৎসা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।
আপনার পরিবারে কি ওষুধের খরচ নিয়ে কোনো সমন্বয় করা হয়েছে? আপনার মতামত শেয়ার করুন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।



