ইরানের রাজধানী তেহরানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণ এবং গৃহীত কঠোর পদক্ষেপের ফলে জানুয়ারি মাসে সংঘটিত প্রতিবাদে কমপক্ষে তেরজনের মৃত্যু ঘটেছে। এই ঘটনা তেহরান ও দেশের অন্যান্য শহরে ২৮ ডিসেম্বর থেকে অব্যাহত অর্থনৈতিক অসন্তোষের প্রতিবাদে রূপান্তরিত বিশাল আন্দোলনের অংশ। নিরাপত্তা বাহিনীর রক্তপাতপূর্ণ হস্তক্ষেপের ফলে প্রাণহানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলেছে।
দশেম্বরের শেষের দিকে অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রা অবমূল্যায়নের কারণে তেহরানে বিশাল জনসমাবেশ শুরু হয়, যা দ্রুতই সরকারবিরোধী প্রতিবাদে রূপান্তরিত হয়। মানবাধিকার সংস্থা অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ৬,০০০ের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যদিও সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে কঠিনতা রয়েছে। এই সময়ে ইন্টারনেটের ব্যাপক বন্ধের পরেও কিছু তরুণ প্রতিবাদকারী বিদেশি মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছেন।
তেহরানের ২৯ বছর বয়সী পারিসা জানান, তিনি জানুয়ারি মাসে ঘটিত সহিংসতায় অন্তত তেরজন পরিচিতের মৃত্যু দেখেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২৬ বছর বয়সী এক তরুণীকে ৮ ও ৯ জানুয়ারি রাতের গুলিবর্ষণে সরাসরি গুলিতে গুলি করে হত্যা করা হয়। পারিসা নিজেও ৮ জানুয়ারি তেহরানের উত্তরাঞ্চলে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদে অংশ নেন, যা তিনি শান্তিপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন, তবে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণ শুক্রবার রাতেই শুরু হয়।
গুলিবর্ষণের সময় প্রতিবাদকারীদের আশপাশে গন্ধের মেঘে গুলি ও গুনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য ভয়াবহ দৃশ্য তৈরি করে। নিরাপত্তা বাহিনীর এই হিংসাত্মক পদক্ষেপের ফলে প্রতিবাদকারীরা শারীরিক ক্ষতি এবং মানসিক আঘাতের শিকার হয়।
তেহরানের ২৪ বছর বয়সী মেহদি, যিনি একই সময়ে প্রতিবাদে অংশ নেন, তাও এই সহিংসতার মাত্রা আগে কখনো দেখেননি বলে জানান। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও বৃহস্পতিবারের গুলিবর্ষণ ও শুক্রবারের সম্ভাব্য অতিরিক্ত গুলিবর্ষণের হুমকি ছিল, তবুও অনেক মানুষ আবারও রাস্তায় বেরিয়ে আসে, কারণ তারা আর সহ্য করতে পারছিল না এবং তাদের কাছে আর কিছু হারানোর নেই।
মেহদি আরও বর্ণনা করেন, তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে সরাসরি গুলিবর্ষণ এবং নিকটবর্তী গুলিতে এক তরুণের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছেন। এই দৃশ্যগুলো তার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং প্রতিবাদকারীদের মধ্যে ভয় ও নিরাশার মিশ্র অনুভূতি তৈরি করেছে।
ইন্টারনেটের ব্যাপক বন্ধের পরেও কিছু তরুণ প্রতিবাদকারী বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পেরেছেন। এই যোগাযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো সম্ভব হয়েছে, যদিও সরকার এই তথ্যের প্রবাহকে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
সরকারি পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপকে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তবে এ ধরনের ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়েছে। গুলিবর্ষণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে ইরানের মানবাধিকার রেকর্ডের ওপর প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, এই ধরনের কঠোর দমনমূলক নীতি দীর্ঘমেয়াদে জনমতকে আরও উত্তেজিত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ এবং মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন সরকারকে নীতি পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করতে পারে, তবে তা বাস্তবায়নে সময় এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি প্রয়োজন।
বর্তমানে তেহরান ও অন্যান্য শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়ে নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রচেষ্টা চালু রয়েছে। তবে প্রতিবাদকারীদের মধ্যে এখনও অব্যাহত অসন্তোষের চিহ্ন দেখা যায়, এবং পরবর্তী সপ্তাহে পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হবে তা অনিশ্চিত রয়ে গেছে।



