ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। নির্বাচন কমিশন কাগজের পোস্টার, ব্যানার ও দেয়াল লিখনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে, আর প্রার্থীদের ডিজিটাল উপকরণ, সামাজিক মাধ্যম এবং অনুমোদিত ইলেকট্রনিক চ্যানেলের মাধ্যমে ভোটারকে পৌঁছানোর অনুমতি দিয়েছে। এই নতুন নিয়মের ফলে প্রার্থীরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে নিজেদের নির্বাচনী পোস্টারকে ‘ডিজিটাল দেয়াল’ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে কোনো দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কাগজের পোস্টার বা ব্যানার দিয়ে প্রচার চালাতে পারবে না। পরিবর্তে নির্ধারিত আকারের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, সামাজিক নেটওয়ার্ক, সভা-সমাবেশ এবং অনুমোদিত ইলেকট্রনিক মাধ্যমের ব্যবহার অনুমোদিত। এই শর্তাবলী প্রয়োগের লক্ষ্য পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রচার কার্যক্রমকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
প্রচারের নতুন রূপকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বলা হচ্ছে, তবে একই সঙ্গে ভুল তথ্যের বিস্তার, প্রযুক্তিগত অপব্যবহার, রাজনৈতিক মেরূকরণ এবং ডেটা গোপনীয়তার লঙ্ঘনের ঝুঁকি উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহারকে এই ঝুঁকির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
ডিজিটাল প্রচারের প্রবণতা ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তেমন স্পষ্ট ছিল না, তবে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকে ফেসবুকে ভোটারকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা বাড়ে। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে প্রার্থীরা সামাজিক মাধ্যমকে মূল প্রচার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ভোটারকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করে। এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে ইন্টারনেট ও মোবাইল ডিভাইসের বিস্তৃত ব্যবহার এখন রাজনৈতিক যোগাযোগের অপরিহার্য অংশ।
নোয়াখালীর একটি আসনের বিএনপি প্রার্থী তার ফেসবুক প্রোফাইলে দলীয় প্রধান তারেক রহমানের পোস্টার শেয়ার করে নিজের নির্বাচনী পোস্টারও যুক্ত করেছেন। একই সময়ে ঢাকা-১২ আসনের একজন প্রার্থী জানিয়েছেন যে তিনি ফেসবুকে বিভিন্ন ধরণের কনটেন্ট প্রকাশ করছেন, যার মধ্যে সরাসরি প্রচার, প্রতিশ্রুতির ফটোকার্ড এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর সমালোচনা অন্তর্ভুক্ত। তিনি উল্লেখ করেন যে তার ডিজিটাল পোস্টার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক সাড়া পায়।
ঢাকা-১৩ আসনের আরেকজন প্রার্থী উল্লেখ করেছেন যে তার প্রচুর সমর্থক রয়েছে, যদিও সরাসরি সব ভোটারকে পৌঁছানো কঠিন, তবু ডিজিটাল পোস্টার তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই পদ্ধতি তাকে ভোটারদের সামনে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে সহায়তা করছে।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, কিছু বিশ্লেষক এবং সিভিল সোসাইটি সংগঠন ডিজিটাল প্রচারের সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে। তারা উল্লেখ করেন যে অনিয়ন্ত্রিত তথ্য প্রবাহ ভোটারকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং গোপনীয় তথ্যের অপব্যবহার রাজনৈতিক মেরূকরণ বাড়াতে পারে। তাই তারা নির্বাচন কমিশনকে ডিজিটাল বিষয়বস্তুর পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী প্রক্রিয়া গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে।
নিয়মের বাস্তবায়ন পরবর্তী নির্বাচনী চক্রে কী প্রভাব ফেলবে তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় যে প্রার্থীরা কম খরচে বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে প্রচার ব্যয়ের কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে এবং প্রচার কৌশলকে আরও ডেটা-চালিত করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা ও গোপনীয়তা সুরক্ষার বিষয়গুলোতে আইনগত কাঠামোকে শক্তিশালী করা জরুরি হবে।
সংক্ষেপে, নির্বাচন কমিশনের পোস্টার নিষেধাজ্ঞা এবং ডিজিটাল প্রচারের অনুমোদন দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগের রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করেছে। প্রার্থীরা ফেসবুকের ‘দেয়াল’কে নতুন প্রচার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে ভোটারকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করছে, তবে তথ্যের গুণমান ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্য যথাযথ তদারকি প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এই ডিজিটাল পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে এবং কীভাবে নিয়ন্ত্রক কাঠামো তা সমর্থন করবে, তা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে।



