বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রশাসন দ্বারা গঠিত ১১ সদস্যের জাতীয় কর সংস্কার টাস্কফোর্স আজ ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের কাছে রিপোর্ট উপস্থাপন করে একক ভ্যাট হার এবং সরাসরি করের অংশ বৃদ্ধি করার সুপারিশ জানায়।
টাস্কফোর্সের প্রধান জায়েদি সাত্তার, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (PRI) এর চেয়ারম্যান, রিপোর্টে বর্তমান বহু ভ্যাট হারকে অদক্ষ বলে উল্লেখ করে একক হার গ্রহণের দাবি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, একক হার না থাকায় ভ্যাট সংগ্রহের গতি ধীর।
প্রস্তাবিত কাঠামোতে প্রথম ধাপে মানক হার এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য নিম্ন হার দু’টি বজায় রাখা হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে একক হারই লক্ষ্য। বর্তমান ভ্যাট সংগ্রহ প্রায় ২.৮ শতাংশে স্থির, একক হার প্রয়োগে সংগ্রহ দ্বিগুণ হতে পারে বলে টাস্কফোর্সের প্রধান অনুমান।
অধিকন্তু, টাস্কফোর্সের মতে দেশের মোট করের প্রায় ৭০ শতাংশই পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় উচ্চ। সরাসরি করের অংশ বাড়িয়ে মোট করের অর্ধেককে সরাসরি করের মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হল দেশীয় সম্পদ সংগ্রহের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে। টাস্কফোর্সের রিপোর্টে এই অনুপাতকে উন্নত না করলে আর্থিক স্বনির্ভরতা হ্রাস পাবে বলে সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে।
রিপোর্টের শিরোনাম “Tax Policy for Development: A Reform Agenda for Restructuring the Tax System” এ বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা “অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল, অদক্ষ এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল” বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি মোট ৫৫টি নীতি বিষয় চিহ্নিত করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে কর ভিত্তি বিস্তৃত করা, করের হার সরলীকরণ, এবং কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি অন্তর্ভুক্ত।
টাস্কফোর্সের সুপারিশের বাস্তবায়ন ব্যবসা খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। একক ভ্যাট হার গ্রহণে মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা বাড়বে, ফলে উৎপাদন ও বিক্রয় চক্রে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমে। একই সঙ্গে সরাসরি করের অংশ বাড়লে উচ্চ আয়কারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের করদায়িত্ব স্পষ্ট হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সরলীকৃত ভ্যাট কাঠামো গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারে, বিশেষ করে প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে কম হারের সুবিধা বজায় থাকলে চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। তবে একক হার প্রয়োগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সতর্ক নীতি সমন্বয় প্রয়োজন।
সরাসরি করের অংশ বাড়াতে উচ্চ আয়কারী সেক্টরে কর সংগ্রহের দক্ষতা বাড়াতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের ব্যবহার বাড়ানো হবে বলে টাস্কফোর্সের পরিকল্পনা। এতে কর ফাঁকি কমে এবং রাজস্বের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে।
অস্থায়ী প্রশাসন টাস্কফোর্সের সুপারিশকে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আইনসভার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করবে এবং প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে।
এই সংস্কার পরিকল্পনা দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে ক্রেডিট রেটিং উন্নত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, টাস্কফোর্সের রিপোর্টে একক ভ্যাট হার, সরাসরি করের অংশ বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থার জটিলতা হ্রাসের মাধ্যমে আর্থিক সম্পদ সংগ্রহের দক্ষতা বাড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৃদ্ধির ভিত্তি মজবুত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।



