মার্চ ২০২৪-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, হৃদপিণ্ডে আক্রমণ (হৃদরোগ) ঘটার পর মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগকারী স্নায়ু পথগুলোই দেহের প্রদাহ ও আরোগ্য প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। পরীক্ষায় ইঁদুরের হৃদপিণ্ডে আক্রমণ সৃষ্টির পর এই স্নায়ু সংকেতগুলোকে বাধা দিলে হৃদয়ের পাম্পিং ক্ষমতা বাড়ে এবং দাগের পরিমাণ কমে। একই সঙ্গে, সংশ্লিষ্ট স্নায়ু কোষে প্রদাহ কমিয়ে আরোগ্যকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) অনুসারে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একবার হৃদরোগের আক্রমণ ঘটে, যা বছরে প্রায় ৮০ লাখের বেশি রোগীর সংখ্যা নির্দেশ করে। হৃদরোগ মূলত করোনারি ধমনীতে রক্তের জমাট বাঁধার ফলে ধমনী বন্ধ হয়ে যায়; যদি এই বন্ধ থাকা দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, তবে হৃদপেশীর কোষগুলো মরে যায়। ফলে হৃদয়ের পাম্পিং ক্ষমতা হ্রাস পায়, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন দেখা দেয় এবং ভবিষ্যতে হৃদযন্ত্রের ব্যর্থতা বা পুনরায় আক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
পূর্বের গবেষণায় জানা গিয়েছিল যে স্নায়ু ও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে প্রদাহ বাড়িয়ে আরোগ্যকে ধীর করে, তবে কোন স্নায়ু কোষ বা কোন সংকেত পথগুলো এই প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা পালন করে তা স্পষ্ট ছিল না। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ডিয়েগোর নিউরোবায়োলজি গবেষক ভিনীত অগাস্টিন এবং তার দল এই ঘাটতি পূরণ করার জন্য হৃদপিণ্ডের আঘাত সনাক্তকারী সংবেদনশীল স্নায়ু কোষগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে গবেষণা শুরু করেন।
গবেষকরা প্রথমে হৃদপিণ্ডের টিস্যু ক্ষতি সনাক্তকারী সংবেদনশীল স্নায়ু কোষগুলো চিহ্নিত করেন এবং দেখেন যে এই কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হৃদপেশীর সংকেত মস্তিষ্কে প্রেরণ করে। এরপর তারা ইঁদুরে এই স্নায়ু সংকেতকে রাসায়নিকভাবে বাধা দেয় এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্নায়ু কোষে প্রদাহজনক অণু কমিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, ইঁদুরের হৃদয়ের পাম্পিং ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয় এবং হৃদপেশীর দাগের পরিমাণ কমে যায়। এই ফলাফল দেখায় যে স্নায়ু‑প্রদাহের চক্রকে ভাঙা আরোগ্যের গতি বাড়াতে পারে।
একজন কার্ডিওলজিস্টের মন্তব্যে বলা হয়েছে, একক অঙ্গের রোগকে আলাদা করে দেখা আর যথেষ্ট নয়; হৃদপিণ্ডের সমস্যাকে স্নায়ু ও ইমিউন সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন থেরাপি বিকাশের সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভবিষ্যতে হৃদরোগের চিকিৎসায় স্নায়ু সংকেতকে লক্ষ্যবস্তু করা ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এই গবেষণার ফলাফল ইঁদুরের মডেলে প্রাপ্ত হলেও, মানবদেহে একই প্রভাব নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ক্লিনিকাল পরীক্ষা প্রয়োজন। স্নায়ু‑প্রদাহের জটিলতা এবং মানবের স্নায়ু নেটওয়ার্কের বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে, নিরাপদ ও কার্যকর থেরাপি তৈরি করতে সময় ও সম্পদ উভয়ই প্রয়োজন। তবুও, এই গবেষণা হৃদরোগের চিকিৎসায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে, যা ভবিষ্যতে রোগীর আরোগ্য সময় কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা হ্রাস করতে সহায়ক হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, হৃদপিণ্ড‑মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগের ভূমিকা এখন স্পষ্ট হয়েছে এবং এই সংযোগকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আরোগ্যকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হতে পারে। তবে, বর্তমান পর্যায়ে এই পদ্ধতি শুধুমাত্র গবেষণার স্তরে রয়েছে; রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানবিক ক্লিনিকাল ট্রায়াল অপরিহার্য।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং সময়মতো চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া এখনও সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ভবিষ্যতে স্নায়ু‑প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের থেরাপি যুক্ত হলে, রোগীর আরোগ্য প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও নিরাপদ হতে পারে—আপনার মতামত কী?



