ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজন যুক্তরাষ্ট্রে নির্ধারিত, তবে তিনটি দেশের সরকার ও ফুটবল সংস্থা এই আয়োজনের বিরুদ্ধে বয়কটের ইঙ্গিত দিয়েছে। পাকিস্তান, ডেনমার্ক এবং জার্মানি যথাক্রমে রাজনৈতিক ও মানবিক উদ্বেগের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে অংশগ্রহণে আপত্তি প্রকাশ করেছে। টুর্নামেন্টের সূচনা ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত নির্ধারিত, অর্থাৎ এখনো পাঁচ মাসেরও কম সময় বাকি।
ইন্ডিয়ান সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিবাসন নীতি ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারাবাহিক সিদ্ধান্তই এই বয়কটের মূল কারণ। ট্রাম্পের শাসনকালে কিছু দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, ইরান এবং হাইতি। এসব দেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের অধিকার পাবে, তবে তাদের ভক্তদের জন্য ম্যাচ দেখার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
এক দশক আগে ফিফার স্বাধীন পরিচালন কমিটির চেয়ারম্যান মার্ক পিয়েত একটি সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে বাড়তে থাকা হেনস্থার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, “আমি ফুটবলপ্রেমীদের একটাই পরামর্শ দেব। আমেরিকা থেকে দূরে থাকুন।” পিয়েতের এই মন্তব্যটি বর্তমান পরিস্থিতিতে পুনরায় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ অনেক ভক্ত ও খেলোয়াড়ই সীমান্তে বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকিকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছেন।
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনো ও ট্রাম্পের মধ্যে সম্পর্ক ভালো বলে জানানো হয়েছে, তবে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রতিবাদে গুলিবর্ষণ ঘটেছে। মিনিয়াপোলিসে এক প্রতিবাদে গুলিবর্ষণ হয়, যার ফলে এক মার্কিন নাগরিকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং বিশ্বকাপের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডেনমার্কের সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ইচ্ছা ও ডেনমার্কের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানোর প্রচেষ্টা ডেনমার্কের ফুটবল সংস্থাকে বয়কটের পথে চালিত করেছে। ডেনমার্কের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, “যদি যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত না হয়, তবে আমরা আমাদের দলকে মাঠে পাঠাতে পারব না।”
জার্মানির ফুটবল সংস্থার সহ-সভাপতি ওক গটলিচ একই সময়ে বয়কটের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, এটাই বয়কট করার সঠিক সময়। কাতারে বিশ্বকাপের সময় রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছিল, এখন একই ধরনের উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যাচ্ছে।” গটলিচের এই মন্তব্যটি জার্মানির ভক্তদের মধ্যে বয়কটের সমর্থন বাড়িয়ে তুলেছে।
নেদারল্যান্ডসের ফুটবল সংস্থা ডেনমার্ক ও জার্মানির সঙ্গে সমন্বয় করে বয়কটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের একটি পিটিশনে প্রায় দেড় লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছে, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রে দলকে পাঠানোর বিরোধিতা করে। পিটিশনের দাবিতে উল্লেখ করা হয়েছে, “যদি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে হিংসা ও গুলিবর্ষণ চলতে থাকে, তবে আমাদের দলকে সেখানে পাঠানো নৈতিকভাবে ভুল হবে।”
ট্রাম্পের শাসনকালে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তালিকায় উল্লেখিত দেশগুলোর ভক্তরা কীভাবে ম্যাচ দেখবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যদিও এই দেশগুলো টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের অনুমোদন পেয়েছে, তবে ভ্রমণ ও টিকিটের সীমাবদ্ধতা তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এই পরিস্থিতি ফিফা কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা ও ভিজিটর সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে পারে।
মার্কিন সরকার এই বয়কটের দাবিগুলোর প্রতি কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি, তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে। ফিফা ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া সংস্থাগুলো এখনো বয়কটের প্রভাব কমাতে কী ধরনের সমঝোতা করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্যায়ে ফিফা ইতিমধ্যে স্টেডিয়াম, হোটেল ও পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে বিশদ পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। তবে বয়কটের হুমকি এই পরিকল্পনাগুলোকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও দর্শক প্রবেশের ক্ষেত্রে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল সম্প্রদায়ের মনোযোগ যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার নীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বয়কটের দাবি করা দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আর ফিফা টুর্নামেন্টের সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে।
ফিফা বিশ্বকাপের শেষ দিন ১৯ জুলাই নির্ধারিত, এবং এখনো বয়কটের দাবিগুলো কীভাবে সমাধান হবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে স্পষ্ট যে, খেলাধুলার মঞ্চে রাজনৈতিক ও মানবিক বিষয়গুলো একত্রে বিবেচনা করা হচ্ছে, এবং এই বিষয়গুলো টুর্নামেন্টের সাফল্য ও গ্রহণযোগ্যতায় প্রভাব ফেলবে।



