দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের পার্শ্ববর্তী জলে জাপানের জেলেদেরকে সাময়িকভাবে মাছ ধরতে না যাওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। জাপান সরকার এই পদক্ষেপটি চীন সঙ্গে বাড়তে থাকা কূটনৈতিক উত্তেজনা কমাতে নেওয়া বলে জানিয়েছে। নির্দেশটি বিশেষ করে সেই জেলেদের জন্য, যারা নিয়মিত এই অঞ্চলে জালের কাজ করেন, যাতে কোনো অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমে।
সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের নিকটবর্তী জলে কাজ করা ৭৬ বছর বয়সী হিতোশি নাকামা এবং ৫৩ বছর বয়সী কাজুশি কিনজো সহ কয়েকজন জেলে, সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সরাসরি ফোনে অনুরোধ পেয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, গত নভেম্বরের শেষ দিকে দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে কোস্ট গার্ড এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে সতর্কতা জানানো হয়। নাকামা এই কলকে অঞ্চল থেকে দূরে থাকার স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এই অনুরোধটি রয়টার্স প্রথম প্রকাশ করে, যা জাপানের নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পূর্বে জাপান সেনকাকু দ্বীপের আশেপাশে জেলেদেরকে মাছ ধরতে উৎসাহিত করত, যাতে তাদের উপস্থিতি দ্বীপের ওপর জাপানের নিয়ন্ত্রণের দাবি শক্তিশালী হয়। এখন এই কৌশল পরিবর্তন করে নিরাপত্তা উদ্বেগের ভিত্তিতে মাছ ধরতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ জাপানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও চীনও এই ভূখণ্ডকে নিজের দাবি করে আসছে। দ্বীপের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে, যা সাম্প্রতিক কালে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি পূর্বে চীন যদি তাইওয়ানে সামরিক পদক্ষেপ নেয় তবে টোকিও সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে সতর্কতা প্রকাশ করেছিলেন। সেই মন্তব্যের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটেছে।
এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সানায়ে তাকাইচিকে সরাসরি অনুরোধ করে, উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে না দেয়ার জন্য পদক্ষেপ নিতে বলেছিলেন। তবে রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি, জাপানের এই সাম্প্রতিক জেলেদের নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নাকি মার্কিন সরকারের চাপে নেওয়া হয়েছে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অনুরোধ সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য না করলেও একটি বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ জাপানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং চীনের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কূটনৈতিক প্রতিবাদ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় দ্বীপের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ইশিগাকির মেয়র ইয়োশিতাকা নাকায়ামা জাপানি কর্মকর্তাদের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে, বর্তমান উত্তেজনার সময়ে কোনো জেলে চীনের হাতে আটক হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে বলে সতর্কতা দিয়েছেন। তিনি জেলেদেরকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, জাপানের এই পদক্ষেপটি কেবলমাত্র সাময়িক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়, বরং চীন-জাপান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গঠনেও প্রভাব ফেলতে পারে। দ্বীপের ওপর মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ অব্যাহত থাকায়, উভয় দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক নীতি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। জাপান যদি জেলেদেরকে দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চল থেকে দূরে রাখতে চায়, তবে তা চীন সঙ্গে আলোচনার নতুন রূপ তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। উভয় দেশই সমুদ্রের নিরাপত্তা ও শিপিং রুটের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে দ্বীপপুঞ্জের চারপাশে কোনো বড় ঘটনা ঘটলে, তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।



